অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের গোপন চুক্তি, সেন্টমার্টিনে যুক্তরাষ্ট্রের ছায়া

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক:: বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতিতে এক গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু। বঙ্গোপসাগরের ওপর আধিপত্য এবং আন্তর্জাতিক শক্তির দ্বন্দ্ব আজ প্রকাশ্য, আর সেই দ্বন্দ্বে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব নতুন করে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদকালে সেন্টমার্টিন দ্বীপে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের গোপন চুক্তির ইঙ্গিত জাতির জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ৫ই আগস্টের নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে অন্যতম প্রভাবশালী কারণই ছিল মার্কিন সামরিক ঘাঁটির ইস্যু। দীর্ঘদিন ধরে সেন্টমার্টিন যুক্তরাষ্ট্রের নজরকেন্দ্র। মুক্তিযুদ্ধের আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই প্রস্তাব দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও একই অবস্থান ধরে রেখেছেন। কিন্তু আজ ড. ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ঐতিহাসিক অবস্থান থেকে সরে আসার পথে রয়েছে বলেই আশঙ্কা প্রকাশ করা হচ্ছে।

সেন্টমার্টিনের এক-তৃতীয়াংশ ৯৯ বছরের জন্য লিজ দেওয়ার প্রস্তাব কেবল ভূখণ্ড হারানো নয় এটি বাংলাদেশের কৌশলগত নিরাপত্তাকে দীর্ঘমেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবের মধ্যে নিয়ে আসার রূপরেখা। বঙ্গোপসাগরে আধিপত্য প্রতিষ্ঠা মানে ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে চীনের বিরুদ্ধে নতুন ঘেরাও নীতি কার্যকর করা। সেই খেলায় বাংলাদেশ পরিণত হচ্ছে পরাশক্তির সংঘর্ষের পরীক্ষাগারে।

আন্তর্জাতিক মানবাধিকার ও গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ (CSIS) এবং ইনস্টিটিউট ফর ডিফেন্স স্টাডিজ অ্যান্ড অ্যানালাইসিস (IDSA) সম্প্রতি প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, বঙ্গোপসাগরের কৌশলগত দ্বীপগুলোতে সামরিক উপস্থিতি শুধু নিরাপত্তার নয়, বরং রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, এই ধরনের চুক্তি সার্বভৌম রাষ্ট্রের নীতি ও সিদ্ধান্তকে দীর্ঘমেয়াদে প্রভাবিত করতে পারে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ৯৯ বছরের লিজ চুক্তি হলে বাংলাদেশ কেবল ভূখণ্ড হারাবে না, বরং আন্তর্জাতিক নীতিনির্ধারণে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সীমিত হবে। ড. আবদুল কাদের, কৌশলগত বিশ্লেষক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গবেষক, বলেন, “যে দেশ দীর্ঘমেয়াদে একটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপের ওপর বিদেশি সামরিক ঘাঁটি রাখতে দেয়, সে রাষ্ট্রের কৌশলগত স্বাধীনতা কমে আসে। এটি শুধু সামরিক বিষয় নয়; অর্থনৈতিক, নৌ-পরিবহন ও বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে প্রভাবও থাকে।”

জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, সেন্টমার্টিনে স্থাপিত ঘাঁটি ভারত-চীন-যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনৈতিক খেলায় বাংলাদেশের ভূমিকাকে সংকীর্ণ করবে। বঙ্গোপসাগরের গভীরতর আধিপত্য মানে শুধু সামরিক উপস্থিতি নয়, এটি দেশীয় নৌ-সীমানার নিরাপত্তা, মৎস্যসম্পদ নিয়ন্ত্রণ এবং সমুদ্রসীমার আন্তর্জাতিক বৈধতা প্রভাবিত করে।

প্রশ্ন হলো এই চুক্তি কি সত্যিই দেশের জনগণের স্বার্থ রক্ষা করে, নাকি জাতিকে এক নতুন দাসত্বের শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে? বঙ্গবন্ধু ও শেখ হাসিনার অটল অবস্থান ইতিহাসে যেভাবে নথিভুক্ত, আজকের প্রজন্ম কি সেই উত্তরাধিকারকে বিসর্জন দেবে?

বাংলাদেশ যদি সত্যিই স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকতে চায়, তবে সেন্টমার্টিনের মতো স্পর্শকাতর ইস্যুতে আপস করা যাবে না। অন্যথায়, ১৯৭১ সালের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা আবারও পরাশক্তির লিজচুক্তির অন্ধকারে হারিয়ে যাবে।