অভিযোগ হলেই চাকরি শেষ আইনের নামে প্রতারণা

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক :: রাষ্ট্র পরিচালনায় ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতা যেমন অপরিহার্য, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে আইনের শাসন ও আত্মপক্ষ সমর্থনের অধিকার। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহে দেখা যাচ্ছে, অভিযোগ উঠলেই—যে কোনো প্রকার সাক্ষ্য, প্রমাণ বা শুনানি ছাড়াই—অফিসারদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হচ্ছে। এটি শুধু অন্যায় নয়, বরং ন্যায়বিচারের মৌল নীতিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে।

একজন অভিযুক্ত ব্যক্তি যত গুরুতর অপরাধেই অভিযুক্ত হোন না কেন, তাঁকে আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া সংবিধান ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনে নিশ্চিত। সিভিল প্রশাসনের ক্ষেত্রে অভিযুক্ত কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হলেও, আপিল ও পুনর্বহালের সুযোগ থাকে। কিন্তু সশস্ত্র বাহিনীর ক্ষেত্রে একবার চাকরি হারালে সেই সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। যদি পরবর্তীতে তিনি নির্দোষ প্রমাণিতও হন, তবু তাঁর পেশাগত জীবন ও সম্মান চিরতরে হারিয়ে যায়।

রাজনীতির ইতিহাসে আমরা বারবার দেখেছি—যখনই রাষ্ট্র কোনো সঙ্কটে পড়ে, তখন সেনাবাহিনীকে “উদ্ধারকর্তা” হিসেবে আহ্বান জানানো হয়। কিন্তু সংকট কেটে গেলে, সেই একই সেনাবাহিনীকে “অপরাধী” হিসেবে চিহ্নিত করে দায় চাপিয়ে দেওয়া হয়। ১৯৯০ সালের গণআন্দোলন থেকে শুরু করে ২০০৭ সালের ওয়ান ইলেভেন—প্রতিবারই রাজনীতিবিদদের ব্যর্থতা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব দেশকে অনিশ্চয়তায় ঠেলে দিয়েছে, আর সেখান থেকে মুক্তি দিয়েছে সেনাবাহিনী। অথচ ইতিহাসের পাতায় তাদের ভূমিকা প্রশংসার বদলে কলঙ্কে রূপান্তরিত হয়েছে।

আজও একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। কিছু সংখ্যক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত চলাকালেই শাস্তি কার্যকর করার প্রবণতা গোটা প্রতিষ্ঠানকেই অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিচ্ছে। তদন্তে যদি পরবর্তীতে আরও নাম উঠে আসে, তবে একে একে শত শত অফিসার চাকরিচ্যুত হবেন—বিনা পেনশনে, বিনা সম্মানে। এতে শুধু ব্যক্তিগত ক্ষতি হবে না, বরং তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও সেনাবাহিনীতে যোগদানের অনুপ্রেরণা মারাত্মকভাবে হ্রাস পাবে।

সেনাবাহিনী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের প্রতীক। এই প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক পালাবদলের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা এবং পরে তাদের কলঙ্কিত করা কোনো সভ্য সমাজের কাজ হতে পারে না। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা অবশ্যই নিতে হবে, তবে তা হতে হবে আইনের যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে, সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ নিশ্চিত করে।

ন্যায়বিচার মানে প্রতিশোধ নয়ন্যায়বিচার মানে প্রমাণ, প্রক্রিয়া ও মর্যাদার সমন্বয়। সেই মূল্যবোধই যদি আমরা হারিয়ে ফেলি, তবে শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়, গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থাই ভেঙে পড়বে।