অর্থনীতি ঝুঁকিতে, ঋণ বাড়ছে—বিনিয়োগ নেই, উন্নয়ন গতি হারাচ্ছে

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক :: বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক বহুমাত্রিক সংকটের ভেতর দাঁড়িয়ে। ঋণের পরিমাণ দ্রুত বাড়ছে, অথচ বিনিয়োগ নেই, কর্মসংস্থান কমছে এবং উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি থমকে যাচ্ছে। এর পেছনে রাজনৈতিক অস্থিরতার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছে অদক্ষ প্রশাসন, অনিয়ম ও দীর্ঘদিনের দুর্নীতিগ্রস্ত আমলাতন্ত্র।

রাষ্ট্র পরিচালনার ব্যয় প্রতিনিয়ত বাড়লেও রাজস্ব আহরণ বাড়ছে না, ফলে ঘাটতি পূরণে সরকারকে নির্ভর করতে হচ্ছে ঋণের ওপর। গত এক বছরে সরকারি মোট ঋণ বেড়েছে প্রায় আড়াই লাখ কোটি টাকা—যা সাম্প্রতিক অর্থনৈতিক বাস্তবতায় একটি নজিরবিহীন ঋণবৃদ্ধি।

অর্থ বিভাগের ঋণ বুলেটিন বলছে, ২০২৫ সালের জুনে রাষ্ট্রের মোট ঋণ দাঁড়িয়েছে ২১ লাখ ৪৪ হাজার ৩৪ কোটি টাকা—এক বছরে বৃদ্ধি ১৪ শতাংশ। বৈদেশিক ঋণ প্রায় ৯.৫ লাখ কোটি এবং অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রায় ১২ লাখ কোটি টাকা।
রাজস্ব আয়ের স্থবিরতা এবং খরচের অনিয়ন্ত্রিত প্রসার এ ঋণভারকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। ২০০৯ সালে যার ঋণ ছিল ২ লাখ ৭৬ হাজার কোটি, তা দেড় দশকে পৌঁছেছে ২১ লাখ কোটি টাকার ওপরে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, অদক্ষ প্রশাসন, দুর্নীতি, অকার্যকর ব্যয়ের সংস্কৃতি এবং ‘দায়িত্বহীন আর্থিক ব্যবস্থাপনা’ পরিশোধ সক্ষমতাকে দ্রুত ক্ষয় করছে।

রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, ব্যাংকিং খাতের অনিয়ম, লুটপাটমূলক ঋণ বিতরণ, উচ্চ সুদের হার, ডলার সংকট এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে নতুন বিনিয়োগ কার্যত থেমে গেছে।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো কাঁচামাল আমদানি ও অর্থায়ন সংকটে উৎপাদন কমাচ্ছে। নতুন চাকরি সৃষ্টি না হয়ে উল্টো ছাঁটাই বাড়ছে। এতে শ্রমবাজার সংকুচিত হচ্ছে এবং অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কমছে।

বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট অনেক উদ্যোক্তা বলছেন—“নীতিগত অনিশ্চয়তার চেয়ে দুর্নীতিই এখন সবচেয়ে বড় বাধা”—যেখানেই যান, সেখানেই ‘শুল্ক-ঘুষ-অনুমতির’ এক অনন্ত চক্র।

সরকার পরিবর্তনের পর অনেক মন্ত্রণালয়ে উন্নয়ন ব্যয় ১০–৩০ শতাংশ কমে গেছে। এডিপি বাস্তবায়ন হার নেমেছে ৬৮ শতাংশের নিচে—গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন।
প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন, প্রশাসনিক বিলম্ব, দুর্নীতিগত ‘কমিশন সংস্কৃতি’ এবং দায়সারা ব্যবস্থাপনার কারণে উন্নয়ন প্রকল্পগুলো ঝুলে আছে। বরাদ্দ কমেছে, কিন্তু কোথাও কোথাও বরাদ্দ থাকলেও কাজ এগোচ্ছে না—কারণ সিদ্ধান্ত গ্রহণে অদক্ষতা এবং অর্থ মুক্তিতে জটিলতা।

অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন থেমে গেলে ঋণ আর্থিক বৃদ্ধিতে পরিণত না হয়ে ভবিষ্যতের দায়ে পরিণত হয়—এটাই এখন ঘটছে।

বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন—মাত্র ৭–৭.৫ শতাংশ।
এর পিছনে আছে—

কর ফাঁকিকে ‘সহজ’ করে দেওয়া অস্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো

রাজনৈতিক প্রভাবে করমুক্তি ও ছাড়

এনবিআরের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি

আমদানি-নির্ভর কর কাঠামো

আধুনিক কর শনাক্তকরণ বাস্তবায়নে ব্যর্থতা

ফলে চলতি অর্থবছরের প্রথম চার মাসেই রাজস্ব ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৭ হাজার কোটি টাকা।

রাজস্ব আদায় না বাড়লে উন্নয়ন ব্যয় কমতেই থাকবে, এবং ঘাটতি পূরণে ঋণ বাড়তেই থাকবে—এই ‘দুষ্টচক্র’ বহু বছর ধরে চললেও এর সমাধানে কার্যকর রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখা যায়নি।

মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয় বৃদ্ধি, অনিয়ম, বিলম্ব, ভুল পরিকল্পনা ও ব্যর্থ দরপত্র ব্যবস্থাপনার কারণে বৈদেশিক ঋণ দ্রুত বেড়েছে। রূপপুর, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেলসহ একাধিক প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি ও সময় ক্ষেপণই আজ দেশের বিদেশি ঋণকে বিপজ্জনক গতিতে বাড়িয়ে তুলেছে।
এডিবি বলছে—দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণ এখন দ্রুততম হারে বাড়ছে।

২০২৬-২৭ সাল থেকে বড় প্রকল্পগুলোর কিস্তি পরিশোধ শুরু হলে চাপ আরও তীব্র হবে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে সুদ পরিশোধে গেছে এক লাখ ৩২ হাজার কোটি টাকা—বৃদ্ধি ১৭ শতাংশ।
বৈদেশিক ঋণের সুদ ২১ শতাংশ এবং দেশীয় ঋণের সুদ ১৬ শতাংশ বেড়েছে। ট্রেজারি বিল-বন্ডের সুদ ব্যয় ৪৩ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ায় বাজেট কার্যত সুদ-নির্ভর হয়ে পড়েছে।

আইএমএফ ইতোমধ্যে বাংলাদেশের বৈদেশিক ঋণকে ‘মধ্যম ঝুঁকিপূর্ণ’ বলে চিহ্নিত করেছে।

বাংলাদেশ এখন মধ্যম আয়ের দেশে প্রবেশ করেছে—কাগজে-কলমে। কিন্তু বাস্তবে রাজস্ব দুর্বল, বিনিয়োগ নেই, উৎপাদন কমছে, উন্নয়ন থমকে আছে, আর প্রশাসনিক অদক্ষতা ও দুর্নীতি পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোকে ভেঙে দিচ্ছে।

ঋণ বাড়ছে কিন্তু সেই ঋণ আয়ে রূপান্তরিত হচ্ছে না। উন্নয়ন ব্যয় বাড়ছে না, উৎপাদনশীলতা বাড়ছে না—অর্থনীতি তাই এক অস্থির সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।

পরিস্থিতি স্পষ্ট:
অদক্ষ প্রশাসন ও দুর্নীতির কারণে অর্থনীতির গতি থেমে যাচ্ছে—ঋণ বাড়ছে, উন্নয়ন আটকে যাচ্ছে, আর ঝুঁকিই হচ্ছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা।