আত্মীয় কোঠায় নিয়োগ পাওয়া সেনাপ্রধান ওয়াকার উজ জামান এর বিশ্বাসঘাতকতা

লেখক: ইমন দত্ত,
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

দিনপত্র ডেস্ক :: রাষ্ট্রের ইতিহাসে কিছু সিদ্ধান্ত থাকে, যেগুলো তাৎক্ষণিক ভুলের গণ্ডি ছাড়িয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিপর্যয়ের বীজ বপন করে। শেখ হাসিনার আমলে সেনাপ্রধান হিসেবে ওয়াকার উজ জামানকে নিয়োগ তেমনই একটি সিদ্ধান্ত—যার খেসারত শুধু সেনাবাহিনী নয়, পুরো রাষ্ট্রকেই দিতে হচ্ছে।

সেনাপ্রধান হওয়ার জন্য যে যোগ্যতা, পেশাগত দক্ষতা, কৌশলগত দূরদর্শিতা, শারীরিক সক্ষমতা এবং নেতৃত্বের দৃঢ়তা প্রয়োজন, ওয়াকার উজ জামানের ক্ষেত্রে সেগুলোর ঘাটতি শুরু থেকেই আলোচনায় ছিল। তার ব্যাচেই ছিলেন অধিক যোগ্য ও চৌকস কর্মকর্তা জেনারেল আকবর ও জেনারেল মতিউর রহমান। অন্য ব্যাচে ছিলেন অভিজ্ঞ ও পেশাদার কর্মকর্তা কিএমজি সাইফুল আলম। সামরিক পেশাদারিত্বের বিচারে এদের সবাই ওয়াকার উজ জামানের তুলনায় অধিক যোগ্য ছিলেন এমন মূল্যায়ন বহু মহলে প্রচলিত। তবু যোগ্যতা নয়, আত্মীয়তার কোটাই চূড়ান্ত হয়ে ওঠে।

এই আত্মীয়-কোটার প্রভাব ছিল গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী। শেখ হাসিনা যে বিশ্বাসে ওয়াকার উজ জামানকে সেনাপতির দায়িত্ব দিয়েছিলেন, সেই আস্থা শেষ পর্যন্ত তার রাজনৈতিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি। ক্ষমতার সর্বোচ্চ পর্যায়ে থাকা সত্ত্বেও তাকে নির্বাসনে যেতে হয়েছে। এটি কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় আস্থা ও কর্তৃত্বের এক গুরুতর বিপর্যয়।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে নির্বাসিত হওয়ার পর ওয়াকার উজ জামান শেখ পরিবারের আত্মীয়স্বজন ও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে বারবার আশ্বাস দিয়েছেন “ধৈর্য ধরুন, আমার উপর আস্থা রাখুন, সময়মতো সব কাজ হবে।” নির্বাচনে অংশগ্রহণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং রাজনৈতিক স্বাভাবিকতা ফেরানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হলেও বাস্তবে তার কোনো দৃঢ় প্রতিফলন দেখা যায়নি। ফলে ধীরে ধীরে আত্মীয়স্বজন ও রাজনৈতিক মহলে তার ওপর আস্থা ভেঙে পড়ে, বিশ্বাস ক্ষয় হয়।
অযোগ্য ব্যক্তি যখন গুরুত্বপূর্ণ পদে বসেন, তখন তারা শুধু নিজের সীমাবদ্ধতাই প্রকাশ করেন না পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকেই দুর্বল করে দেন। সেনাবাহিনীর মতো একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ও পেশাদার প্রতিষ্ঠানে নেতৃত্বের দুর্বলতা মানে সিদ্ধান্তহীনতা, আর সিদ্ধান্তহীনতা মানে নিরাপত্তার ঝুঁকি। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানের ওপর।

সমালোচকদের মতে, ওই সময়ে সেনাপ্রধান আইন ও সাংবিধানিক রীতিনীতি লঙ্ঘন করেছেন এবং নির্বাচিত সরকারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। নিরাপত্তার অজুহাতে প্রধানমন্ত্রীকে দেশত্যাগে বাধ্য করার অভিযোগও উঠেছে।

পরবর্তীতে ড. ইউনুসের নেতৃত্বে একটি বিদেশি প্রভাবিত ও অসাংবিধানিক কাঠামো গঠনের মাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালনার পথ নেওয়া হয়েছে যা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য গভীর সংকট তৈরি করেছে বলে বিশ্লেষকদের মত।

এই প্রক্রিয়ায় দেশের সংবিধান ও সার্বভৌমত্ব ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই সময়ে জঙ্গিবাদ, অর্থনৈতিক ক্ষয় এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বেড়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা থেমে গেছে, সাধারণ জনগণ চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই পরিস্থিতি শুধু সামরিক নেতৃত্বের সীমাবদ্ধতার ফল নয় এটি রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভুল সিদ্ধান্তের ধারাবাহিক পরিণতি। রাষ্ট্র টিকে থাকে যোগ্যতা, নৈতিকতা ও সংবিধানের প্রতি আনুগত্যের ওপর।

আত্মীয়তার ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দিলে শুধু পদটির মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয় না রাষ্ট্র ও জনগণের নিরাপত্তাও ঝুঁকির মুখে পড়ে।
ইতিহাস স্পষ্ট অযোগ্যতার ওপর দাঁড়িয়ে কোনো ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী হয় না।

শেখ হাসিনার নির্বাসন কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনা নয় এটি ভুল সিদ্ধান্তের সমষ্টিগত ফল। ওয়াকার উজ জামান সেই ভুল সিদ্ধান্তগুলোর অন্যতম প্রতীক। ইতিহাস ক্ষমা করে না।

সংবিধান লঙ্ঘন ও বিশ্বাসঘাতকতার অভিযোগ একদিন বিচারের কাঠগড়ায় আসবেই এই প্রত্যাশাই আজ অনেকের কণ্ঠে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।