দিনপত্র ডেস্ক :: বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে বেশি অপব্যবহৃত শব্দগুলোর একটি হলো “আপোষহীন নেত্রী”—আর সবচেয়ে অনায়াসে যাকে এই তকমা পরানো হয়েছে, তিনি খালেদা জিয়া। এই অভিধা বাস্তব ইতিহাসের ফল নয়; এটি পরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রচারণা। কারণ খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের দিকে তাকালেই দেখা যায়—তিনি কখনোই আপোষহীন ছিলেন না, বরং ক্ষমতার স্বার্থে তিনি বারবার আপোষ করেছেন, করেছেন নৈতিকতা ও গণতন্ত্রের সঙ্গে।
খালেদা জিয়ার রাজনীতিতে প্রবেশই হয়েছিল আপোষের ভেতর দিয়ে। সামরিক শাসক এরশাদের বৈধতা সংকটের সময় বিএনপি বিরোধিতার কথা বললেও, বাস্তবে এরশাদের দেওয়া রাষ্ট্রীয় সুবিধা গ্রহণে তাদের কোনো দ্বিধা ছিল না। এরশাদের দেওয়া ক্যান্টনমেন্টের বাড়ি সাদরে গ্রহণ করা কি আপোষহীনতার নমুনা? না কি এটি ক্ষমতার সঙ্গে সহাবস্থানের স্বীকৃতি?
ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রশ্নে খালেদা জিয়া আপোষ করেছেন জনগণের ভোটাধিকারের সঙ্গেও। ১৯৯৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ছিল একতরফা, আন্তর্জাতিকভাবে প্রত্যাখ্যাত এবং রক্তাক্ত। তবুও সেই নির্বাচন আয়োজন করে ক্ষমতা ধরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। একজন আপোষহীন নেত্রী হলে তিনি ক্ষমতার বৈধতা সংকটে জনগণের মুখোমুখি হতেন, পাতানো নির্বাচনের আশ্রয় নিতেন না।
নৈতিকতার প্রশ্নে সবচেয়ে বড় আপোষটি ছিল যুদ্ধাপরাধী ও সাম্প্রদায়িক শক্তির সঙ্গে জোট। জামায়াতে ইসলামী, গোলাম আজম, নিজামী—এরা কেউ বিএনপির কাঁধে চড়ে রাজনীতিতে ফেরেনি, বরং বিএনপিই তাদের রাষ্ট্রক্ষমতার দরজা খুলে দিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে যে দল আপোষ করে, তার নেত্রীকে “আপোষহীন” বলা রাজনৈতিক রসিকতা ছাড়া কিছু নয়।
২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা খালেদা জিয়ার নেতৃত্বের নৈতিক দেউলিয়াপনার চূড়ান্ত প্রমাণ। ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ রাজনৈতিক হামলার পর রাষ্ট্র সত্য উদঘাটনের পথে না গিয়ে দায় ঢাকার পথে হেঁটেছে। জজ মিয়া নাটক, তদন্তে বাধা, রাষ্ট্রীয় নীরবতা—এসব কি আপোষহীন নেতৃত্বের লক্ষণ, নাকি অপরাধের সঙ্গে আপোষ করার নমুনা?
ক্ষমতা ছাড়ার প্রশ্নেও খালেদা জিয়া কখনোই আপোষহীন ছিলেন না। ১৯৯৬ ও ২০০৬—দু’বারই তাকে ক্ষমতা ছাড়তে হয়েছে গণআন্দোলন, রক্তপাত ও রাষ্ট্রীয় সংকটের মুখে। তিনি কখনো স্বেচ্ছায়, রাজনৈতিক পরিপক্বতায় ক্ষমতা ছাড়েননি। অথচ এই ইতিহাস উপেক্ষা করেই তাকে “আপোষহীন” বলা হয়, আর যে নেত্রী ২০০১ সালে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছিলেন, তাকে বলা হয় ক্ষমতালোভী।
খালেদা জিয়ার “আপোষহীনতা” আসলে জনগণের সঙ্গে নয়, বিরোধীদের সঙ্গে নয়—এই আপোষহীনতা ছিল কেবল ক্ষমতা হারানোর ভয় নিয়ে। ক্ষমতা থাকলে আপোষ, ক্ষমতা গেলে আন্দোলনের ডাক—এটাই ছিল তার রাজনৈতিক সূত্র। এতে নৈতিক দৃঢ়তা নেই, আছে কেবল কৌশলগত সুবিধাবাদ।
সত্যটা কঠিন কিন্তু স্পষ্ট—খালেদা জিয়া ছিলেন আপোষহীন নেত্রী নন, তিনি ছিলেন ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির এক প্রতীক। তাকে আপোষহীন বানিয়ে তোলা হয়েছে ইতিহাস মুছে, রক্ত ঢেকে, আর দ্বিচারিতাকে জায়েজ করার জন্য। এই মিথ ভাঙা জরুরি, কারণ মিথের ওপর দাঁড়িয়ে কোনো গণতন্ত্র টিকে না।