গাজীপুর থেকে বিশেষ প্রতিনিধি:
গাজীপুর এখন এক আতঙ্কের নগরীতে পরিণত হয়েছে। সাংবাদিক হত্যা, প্রকাশ্যে কুপিয়ে জখম, ছিনতাই, চাঁদাবাজি এবং পারিবারিক কলহের জেরে একের পর এক নৃশংস হত্যাকাণ্ড শহরবাসীর মধ্যে চরম নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিয়েছে। গত ৭ মাসে গাজীপুর মহানগর ও জেলা মিলিয়ে ১০৩টি খুনের ঘটনা ঘটেছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহ অবনতির চিত্র তুলে ধরেছে।
মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে দুটি চাঞ্চল্যকর ঘটনা পুরো এলাকাকে স্তব্ধ করে দিয়েছে। গত বৃহস্পতিবার রাতে গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা এলাকায় দুর্বৃত্তদের চাপাতির কোপে নির্মমভাবে খুন হন সাংবাদিক মো. আসাদুজ্জামান তুহিন। এর আগের দিনই নগরীর সাহাপাড়া এলাকায় আরেক সাংবাদিক আনোয়ার হোসেনকে প্রকাশ্যে পিটিয়ে পা থেঁতলে দেওয়া হয়। এই দুই ঘটনার রেশ না কাটতেই শুক্রবার টঙ্গীর স্টেশন রোড এলাকা থেকে ব্যাগে ভরা এক যুবকের খণ্ডিত মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
অপরাধের লাগামহীন বিস্তার:
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ৭ মাসে গাজীপুর জেলার ৫টি থানায় (শ্রীপুর, কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া ও সদর) ৫৯টি এবং গাজীপুর মহানগরের ৮টি থানায় ৩৫টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। অর্থাৎ, গড়ে প্রতি দুই দিনে একটি খুনের ঘটনা ঘটছে।
এসব হত্যাকাণ্ডের পেছনে রয়েছে রাজনীতি, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, ছিনতাই, জমিসংক্রান্ত বিরোধ, পারিবারিক কলহ এবং পূর্বশত্রুতার মতো নানা কারণ। গাজীপুর চৌরাস্তা, চান্দনা, টঙ্গীসহ নগরীর বেশ কিছু এলাকা অপরাধীদের চিহ্নিত আস্তানা হয়ে উঠলেও তাদের দমনে জোরালো কোনো পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয় বলে অভিযোগ সাধারণ মানুষের।
নৃশংসতার নানা রূপ:
পারিবারিক সহিংসতা: গত শনিবার রাতে পারিবারিক কলহের জেরে স্ত্রী মারুফা আক্তারকে শ্বাসরোধ করে হত্যার পর ঘরে আগুন ধরিয়ে দেয় স্বামী মিজানুর রহমান। এর মাত্র তিন দিন আগে শ্রীপুরে স্বামী নূরুল ইসলামের পিটুনিতে নিহত হন সুইটি আক্তার নামে এক গৃহবধূ।
কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য: গত ২৭ মে চাঁদা না দেওয়ায় ৯০ বছর বয়সী নাসির পালোয়ানকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে কিশোর গ্যাং। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ২ জুলাই তিনি মারা যান।
ছিনতাইকারীর হাতে খুন: গত ১১ জুলাই টঙ্গীতে ছিনতাইকারীর হামলায় কলেজছাত্র মাহফুজুর রহমান এবং ১৭ মে টঙ্গী ফ্লাইওভারে রঞ্জু নামে এক যুবক খুন হন।
গণপিটুনি: আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে। গত ১৮ জুলাই কাপাসিয়ায় মো. নূরুল ইসলামকে এবং ২৭ জুন কোনাবাড়ীতে চোর সন্দেহে হৃদয় মিয়া নামে এক যুবককে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও বিশ্লেষণ:
গাজীপুর জেলা পুলিশ সুপার চৌধুরী মো. যাবের সাদেক জানান, জেলার ৫৯টি হত্যাকাণ্ডের মধ্যে ৪৮টির রহস্য উদ্ঘাটন করে ৫২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তিনি সামাজিক অবক্ষয় ও মূল্যবোধের অভাবকে অপরাধ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, “গত ১৭ বছরে দেশের একটা প্রজন্ম নষ্ট হয়ে গেছে। আইন বলতে যে একটা জিনিস আছে– সেটা তাদের মনেই হয় না।”
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মমিনুল ইসলাম বলেন, “অনেক ঘটনা সামাজিক অবক্ষয় ও বিচ্যুতির কারণে ঘটছে। পুলিশ প্রশাসনেও ভঙ্গুর দশা। এর প্রভাব পড়ছে সার্বিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে।”
সব মিলিয়ে, একের পর এক হত্যাকাণ্ডে গাজীপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অপরাধীদের অভয়ারণ্য ভেঙে দিয়ে নাগরিক জীবনে নিরাপত্তা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন শহরবাসী।
#গাজীপুর #খুন #অপরাধ #হত্যাকাণ্ড #গাজীপুরেহত্যা