নিউজ ডেস্ক ::রাজধানীর গুলশানে আওয়ামী লীগের সংরক্ষিত নারী আসনের সাংসদ শাম্মী আহমেদের বাসায় কোটি টাকার চাঁদাবাজি—এই আলোচিত মামলার নেপথ্যে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ উঠেছে। গ্রেপ্তার হওয়া বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক ছাত্র সংসদের (বাগছাস) নেতা ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের (বৈছা) সমন্বয়ক জানে আলম অপু ৩৭ মিনিটের এক ভিডিও জবানবন্দিতে এই অভিযোগ তুলে ধরেন।
এই ভিডিও আজ ১৩ই আগস্ট রাতে সাংবাদিক জাওয়াদ নির্ঝর তার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে আংশিক প্রকাশ করেন। ভিডিওর সঙ্গে যুক্ত করা হয় ওয়েস্টিন হোটেলের সামনের সিসিটিভি ফুটেজ, যাতে দেখা যায়—ভোর ৪টার দিকে কোনো সরকারি প্রটোকল ছাড়াই উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ গুলশানের এক এলাকায় প্রবেশ করছেন এবং সমন্বয়ক রিয়াদ ও অপুদের সঙ্গে গোপন সাক্ষাৎ করছেন।
চাঁদাবাজির ঘটনার টাইমলাইন
চাঁদাবাজির ঘটনার প্রেক্ষিতে দায়েরকৃত মামলায় ডিবি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র (বৈছা) আন্দোলনের সম্মিলিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাক রিয়াদ। আর জানে আলম অপু ২৬শে জুলাই রাতের ঘটনার পর থেকেই পলাতক ছিলেন। পরে গ্রেপ্তার হন তিনিও।
অভিযোগ অনুযায়ী, রিয়াদ, অপু ও তার সহযোগীরা এমপি শাম্মী আহমেদের বাসায় গিয়ে কোটি টাকা দাবি করেন। সেই মামলায় আটক রিয়াদের বাসা থেকে ৩০শে জুলাই ২ কোটি ২৫ লাখ টাকার চেক এবং ২০ লাখ টাকার এফডিআর উদ্ধার হয়।
২৬শে জুলাই বিকেলে বাকি ৪০ লাখ টাকা নিতে রিয়াদ তার গ্যাংয়ের ইব্রাহিম হোসেন মুন্না, সিয়াম ও সাদমানকে এমপির বাসায় পাঠান। পরে রিয়াদ নিজেও সেখানে যান। তখনই পুলিশ উপস্থিত হয়ে তাদের টাকাসহ গ্রেপ্তার করে।
২৬শে জুলাই রাতে পুলিশ এমপি বাসা থেকে রিয়াদসহ চারজনকে গ্রেপ্তার করে। পরে তাদের ৭ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। এরপর সংগঠন থেকে অভিযুক্তদের বহিষ্কার করা হয় এবং সারাদেশে বৈছার সব কমিটি স্থগিত ঘোষণা করা হয়।
এর আগে, ২৬শে জুলাই রাত সাড়ে ১২টার দিকে ভুক্তভোগী সিদ্দিক আবু জাফর গুলশান থানায় মামলা করেন। মামলায় ছয়জনকে আসামি করা হয়। মামলার আরেক অভিযুক্ত শিশু মো. আমিনুল ইসলামকে গাজীপুর কিশোর উন্নয়ন কেন্দ্রে পাঠানো হয়েছে।
রিয়াদ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে জানান, এমপির স্বামী সিদ্দিক আবু জাফরের কাছ থেকে প্রথমে ১০ লাখ টাকা নেন অপু। পরে ৫০ লাখ টাকা দাবি করে আরও টাকা নিতে গেলে পুলিশ তাদের গ্রেপ্তার করে। রিয়াদের ভাষ্য, পুরো ঘটনার পরিকল্পনা হয় আগের রাতেই এবং অপুই সরাসরি টাকার দাবি তোলেন।
অপুর ভিডিও জবানবন্দির নতুন তথ্য
জানে আলম অপুর দাবি, এই পুরো চাঁদাবাজি পরিকল্পনার নির্দেশ এসেছিল অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের কাছ থেকে। গ্রেপ্তারের আগে রেখে যাওয়া ভিডিও বক্তব্যে অপু বলেন, ২৬শে জুলাই ভোর ৪টার দিকে ওয়েস্টিন হোটেলের কাছাকাছি গোপনে তাদের সঙ্গে দেখা করেন আসিফ। সেখানেই আওয়ামী লীগের সাংসদের বাসায় চাপ সৃষ্টি করে কোটি টাকা আদায়ের নির্দেশ দেন তিনি।
অপু জানান, এই “বড় ভাই” আসিফ মাহমুদই সমন্বয়কদের দিয়ে চাঁদাবাজি করিয়েছেন।
সিসিটিভি প্রমাণ ও সাংবাদিকের বক্তব্য
সাংবাদিক জাওয়াদ নির্ঝর জানান, কয়েকদিন ধরে এই ঘটনা নিয়ে অনুসন্ধান করছিলেন তারা। প্রভাবশালী মহলের চাপের কারণে সম্পূর্ণ ভিডিও আগে প্রকাশ করা যায়নি। কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে ভিডিও ফাঁস হয়ে গেলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে বাধ্য হন।
তিনি তার প্রোফাইল থেকে ছোট আকারে ভিডিওটি প্রকাশ করেন। তাতে চাঁদাবাজিতে যাওয়ার পূর্বের সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ যুক্ত করে দেখান—ভোর ৪টার দিকে উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ ওয়েস্টিন হোটেলের সামনে উপস্থিত হন এবং কিছুক্ষণ পরই চাঁদাবাজি অভিযুক্ত রিয়াদ ও অপুদের সঙ্গে দেখা করেন।
অব্যাহত নীরবতা ও অজানা প্রশ্ন
এখনো পর্যন্ত উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদের কাছ থেকে এ বিষয়ে কোনো ব্যাখ্যা আসেনি। কেন তিনি সরকারি প্রটোকল ছাড়া ভোরে গুলশানের ওই এলাকায় গেলেন এবং কেন মামলার আসামিদের সঙ্গে বৈঠক করলেন—এসব প্রশ্নের উত্তর মেলেনি।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একাধিক সূত্র জানিয়েছে, অপুর ভিডিও ও সিসিটিভি ফুটেজ যাচাই করে দেখা হচ্ছে।