নয়াদিল্লি | ঢাকা:
ভারতের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্য, বিদ্বেষ ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন চললেও জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে শেষ পর্যন্ত ভারতের কাছেই ফিরতে হলো ড. মুহাম্মদ ইউনুস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারকে। ডিজেল আমদানির জন্য ফের ভারতের নুমালীগড় রিফাইনারি লিমিটেড (NRL)–এর সঙ্গে চুক্তি করল বাংলাদেশ সরকার।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত মোট ১ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে ব্যয় হবে প্রায় ১ হাজার ৪৬১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা।
সরকারি বৈঠকে অনুমোদন
মঙ্গলবার ঢাকার সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠকে এই আমদানির প্রস্তাব অনুমোদন পায়।
বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা NRL থেকে ডিজেল আমদানির প্রস্তাব উত্থাপন করলে তা বিস্তারিত পর্যালোচনার পর অনুমোদন দেওয়া হয়।
ব্যয় ও অর্থায়নের বিস্তারিত
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে—
মোট ব্যয়: ১১ কোটি ৯১ লাখ ৩৩ হাজার ২১৬ মার্কিন ডলার
অর্থায়ন: বিপিসির নিজস্ব বাজেট + ব্যাংক ঋণ
ডিজেলে সালফারের পরিমাণ: মাত্র ০.০০৫% (আন্তর্জাতিক মানসম্মত)
চুক্তি অনুযায়ী—
প্রতি ব্যারেল ডিজেলের প্রিমিয়াম: ৫.৫০ মার্কিন ডলার
রেফারেন্স মূল্য: ৮৩.২২ মার্কিন ডলার
এই মূল্য কাঠামো নেগোসিয়েশনের মাধ্যমে চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানানো হয়েছে।
১৫ বছরের চুক্তি, পাইপলাইনে সরবরাহ
বাংলাদেশ–ভারতের মধ্যে ডিজেল আমদানির সম্পর্ক নতুন নয়।
২০১৬ সাল থেকে ১৫ বছর মেয়াদি চুক্তির আওতায় ভারত থেকে বাংলাদেশে ডিজেল সরবরাহ হচ্ছে।
শুরুতে রেলওয়াগনে পরিবহণ হলেও—
২০২৩ সালের ১৮ মার্চ থেকে
ইন্ডিয়া–বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইনের মাধ্যমে
সরাসরি ডিজেল আসছে বাংলাদেশে।
সরকারি ভাষ্য অনুযায়ী, এতে পরিবহণ ব্যয় কমেছে এবং সরবরাহ ব্যবস্থা আরও স্থিতিশীল হয়েছে।
রাজনৈতিক বিতর্ক ও সরকারের ব্যাখ্যা
সম্প্রতি ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে ভারত থেকেই ডিজেল আমদানির সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক মহলে নতুন জল্পনা সৃষ্টি করেছে।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উপদেষ্টা
মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান বলেন—
“এটি নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নয়। এটি পুরোনো ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির অংশ। নতুন করে কিছু করা হয়নি।”
বিশ্লেষণ: বাস্তবতায় ভারতের উপর নির্ভরতা
বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক বক্তব্য যতই কঠোর হোক না কেন—
জ্বালানি নিরাপত্তা
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা
পরিবহণ, বিদ্যুৎ ও কৃষিখাতের চাহিদা
এই বাস্তবতায় ডিজেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানিতে ভারত এখনও বাংলাদেশের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য উৎস।
সব মিলিয়ে, ভারতবিরোধী রাজনৈতিক বয়ানের মাঝেও বাস্তব প্রয়োজনে ভারতীয় জ্বালানির উপর নির্ভরতা যে অটুট, এই সিদ্ধান্ত তা আবারও স্পষ্ট করে দিল।