জুলাই ২০২৪-এর আন্দোলনে ঢাকায় ২০ হাজার ভুয়া মামলা, ৭০ লাখ আসামি, রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার অস্বাভাবিক বিস্তার

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

ডেস্ক নিউজ দিনপত্র:: জুলাই ২০২৪ সালের অস্থির রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ঢাকা মহানগর ও ঢাকা জেলার বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া মামলাগুলোর পরিমাণ ও প্রকৃতি জাতীয় রাজনীতিতে অভূতপূর্ব আলোচনার জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক মহলে প্রচারিত তথ্য ও অভিযোগ অনুযায়ী—ডিএমপি এবং ঢাকার বিভিন্ন থানায় মোট মামলার সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার, এবং এসব মামলায় আসামি দেখানো হয়েছে প্রায় ৭০ লাখ মানুষকে। সংখ্যাটি বাংলাদেশের ইতিহাসে তো বটেই, দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহেও এক নজিরবিহীন অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অভিযোগ অনুসারে মামলার তালিকায় আসামি হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন মূলত আওয়ামী লীগপন্থী নেতা–কর্মী, সমর্থক ও ব্যবসায়ীসহ বিপুল সংখ্যক সাধারণ মানুষ, যেখানে বাদী করা হয়েছে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি সংশ্লিষ্ট সেই সব ব্যক্তিদের, যাদের বিরুদ্ধেই আন্দোলনের সময় জ্বালাও-পোড়াও, ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ও সহিংসতার অভিযোগ উঠেছিল।
এই অস্বাভাবিক ভূমিকা-বিন্যাস জনমনে গভীর প্রশ্ন ও বিতর্ক সৃষ্টি করেছে—কীভাবে সহিংসতার অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে, তারাই মামলার বাদী হলো, আর আক্রান্ত বা ক্ষতিগ্রস্ত পক্ষই হয়ে গেল আসামি?

এমন পরিস্থিতিতে আরেকটি গুরুতর অভিযোগ সামনে আসে—মামলার বিপুল আসামির তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য নেপথ্যে নাকি চলেছে বিশাল অঙ্কের অর্থ লেনদেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের একটি অংশ দাবি করছে, এই ৭০ লাখ আসামির বিশাল প্যাকেটে ঢুকে পড়া হাজার হাজার নিরীহ নাগরিক ও ব্যবসায়ীর তালিকা থেকে নাম সরিয়ে দিতে হয়েছে কোটি কোটি টাকার ‘দেনদরবার’।

এ সবকিছুকে কেন্দ্র করে বিরোধী দল ও বিশ্লেষকদের অভিযোগ—এটি নাকি ছিল ইউনুস সরকারের জটিল ও সুসমন্বিত এক নকশা, যার উদ্দেশ্য ছিল রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ সুদৃঢ় করা এবং প্রতিপক্ষ শক্তিকে বিচ্ছিন্ন রাখা। তাদের ভাষায়, পুরো প্রক্রিয়াটি যেন একধরনের “ম্যাজিক” বা “ম্যাটিকুলাস ডিজাইন”—যেখানে রাজনৈতিক দায় উল্টো পথে ঘুরে যায়, আর প্রশাসনিক নথিপত্র বাস্তব ঘটনাপ্রবাহের বিপরীত চিত্র আঁকে।

অন্যদিকে, সাধারণ মানুষের উপলব্ধিতে এসব মামলার প্রভাব ছিল ব্যাপক। কেউ জানতেন না তিনি আসামি তালিকায় আছেন কি না; থানায় গিয়ে সঠিক তথ্য পাওয়া কঠিন; এবং প্রতিদিনই ছড়িয়েছে নতুন গুজব—কার নাম কোথায় উঠে গেছে, কার নাম সরাতে কত টাকা লেগেছে, বা কার বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে গ্রেপ্তার অভিযান হতে পারে। রাষ্ট্রীয় প্রক্রিয়ার এই অনিশ্চয়তা সমাজে এক ধরনের নিরাপত্তাহীনতার আবহ তৈরি করে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন একটাই—
জুলাই ২০২৪–এর আন্দোলন-পরবর্তী মামলার এই বিশাল ঢেউ কি আইন-শৃঙ্খলা রক্ষার স্বাভাবিক প্রয়াস ছিল, নাকি রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে বাস্তবতাকে ভিন্ন আকার দেওয়ার এক অপারেশন?

এই প্রশ্নের উত্তর সময়ই দেবে। কিন্তু ২০ হাজার মামলা ও ৭০ লাখ আসামির অস্বাভাবিক সংখ্যা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ রাজনৈতিক ইতিহাসে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকবে।