নিউজ ডেস্ক :: সেনা ছাউনি থেকেই বিশ্বাসঘাতকতার বীজের জন্ম। ইতিহাস সাক্ষী, বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের প্রতি বিশ্বাস ভঙ্গের ধারাবাহিকতা যেন এক অভিশপ্ত চক্রের মতো বারবার ফিরে আসে। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করেছিলেন জিয়াউর রহমান জিয়ার সঙ্গে করেছিলেন এরশাদ খালেদা জিয়ার সঙ্গে করেছিলেন জেনারেল মইন উদ্দিন আর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বিশ্বাস ভঙ্গ করেছেন জেনারেল ওয়াকার উজ জামান।
চার দশকের ব্যবধানে চরিত্র বদলেছে, কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতার রূপ অপরিবর্তিত—একই ষড়যন্ত্র, একই লোভ, একই অন্ধ ক্ষমতালিপ্সা।
*বিশ্বাসঘাতকতার উত্তরাধিকার*
জেনারেল জিয়াউর রহমান থেকে শুরু করে জেনারেল ওয়াকার পর্যন্ত প্রত্যেকেই রাষ্ট্রনায়কের বিশ্বাসের আসনে বসে বিশ্বাসঘাতকতার পাঠ রচনা করেছেন।
তারা কেউই হঠাৎ করে বিশ্বাসঘাতক হননি; বরং ধীরে ধীরে ক্ষমতার নেশা ও ব্যক্তিগত স্বার্থের মোহে তারা নিজেরাই নিজেদের কাছে পরাজিত হয়েছেন।
বঙ্গবন্ধুর ঘনিষ্ঠ সেনা কর্মকর্তা জিয়া যেমন মুক্তিযুদ্ধের বীরত্বকে বিশ্বাসঘাতকতার অন্ধকারে হারিয়ে ফেলেছিলেন, তেমনি ওয়াকারও শেখ হাসিনার আস্থার প্রতীক থেকে পরিণত হয়েছেন কলঙ্কিত চরিত্রে।
*অন্যদের থেকে ভিন্ন, তবু একই ছায়া*
জেনারেল ওয়াকার হয়তো অন্যদের চেয়ে ভিন্ন ছিলেন এক দিক দিয়ে তিনি ছিলেন না চৌকস সেনা কর্মকর্তা, বরং তোষামদী ও প্রশাসনিক কূটকৌশলে পারদর্শী।
দিন যতই গিয়েছে, তাঁর কর্মকাণ্ডে প্রকাশ পেয়েছে যোগ্যতার ঘাটতি।
তিনি পদে উঠেছেন মেধা নয়, প্রশংসার বিনিময়ে; আর এ ধরনের পদোন্নতি একসময় রাষ্ট্রযন্ত্রে অস্থিতিশীলতা ডেকে আনে।
ইতিহাস বলে যারা তোষামোদে সফল, তারা একদিন না একদিন নিজেদের নিরাপত্তার জন্য বিশ্বাসঘাতকতাকে হাতিয়ার বানায়।
*১৯৭৫ সালেবিশ্বাসের প্রতিদানে রক্ত*
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর জিয়াউর রহমান ছিলেন বঙ্গবন্ধুর আস্থাভাজন সেনা কর্মকর্তা।
কিন্তু সেই বিশ্বাসের প্রতিদান ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে নির্মম অধ্যায় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত ভোর।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের হত্যা করা হয়, এবং জিয়া সেই হত্যাযজ্ঞে নীরব সমর্থন দিয়ে ইতিহাসে স্থান পান “বিশ্বাসঘাতক জেনারেল” হিসেবে।
বঙ্গবন্ধুর হাতে নির্মিত রাষ্ট্রযন্ত্র ভেঙে পড়ে সামরিক শাসনের অন্ধকারে।
রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কেড়ে নেয়া হয়েছিল ষড়যন্ত্রকারীদের হাত ধরে।
*২০২৪ সালে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি*
অর্ধশতাব্দী পরে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টে আবারও ইতিহাস যেন নিজেকে পুনরাবৃত্তি করল।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দীর্ঘদিনের আস্থাভাজন সেনা কর্মকর্তা জেনারেল ওয়াকার উজ জামান হঠাৎই ভিন্ন পথে হাঁটলেন।
বিশ্বাসের বিনিময়ে উপহার দিলেন অভ্যুত্থান একটি রক্তহীন কিন্তু রাষ্ট্রবিনাশী ষড়যন্ত্র।
যে নেত্রী তাঁকে সুযোগ দিয়েছিলেন, সেই নেত্রীকেই অপসারণ করে তিনি দাঁড়ালেন ইতিহাসের অভিযুক্ত আসনে।
রাষ্ট্রের উন্নয়নের ধারাবাহিকতা থেমে গেল, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের মর্যাদা হুমকির মুখে পড়ল।
১৯৭৫-এর মতোই এবারও বিশ্বাসঘাতকতার মূল ক্ষতি হলো দেশের ভবিষ্যৎ ও জনগণের আস্থা।
*চৌকসতা নয়, চাটুকারিতার উত্তরাধিকার*
জেনারেল ওয়াকারকে অনেকেই ভাবতেন আধুনিক সেনা কর্মকর্তা, বাস্তবে তিনি ছিলেন প্রশাসনিক চাতুর্যের কারিগর।
তিনি জানতেন কীভাবে ঊর্ধ্বতনদের প্রশংসা করে পদোন্নতির সিঁড়ি বেয়ে উপরে ওঠা যায়, কিন্তু জানতেন না কীভাবে নেতৃত্ব দিতে হয়।
এমন কর্মকর্তারা ক্ষমতার ছায়ায় বেড়ে ওঠেন; কিন্তু যখন সেই ছায়া সরে যায়, তারা ভয়ে নিজেদের বাঁচাতে রাষ্ট্রের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে বসেন।
১৯৭৫-এর জিয়া যেমন মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পদদলিত করেছিলেন, তেমনি ওয়াকারও সেনাবাহিনীর মর্যাদা ও শৃঙ্খলার ভিত নাড়িয়ে দিলেন।
তারা উভয়েই প্রমাণ করেছেন—চাটুকাররা কখনো রাষ্ট্ররক্ষক হতে পারে না, বরং রাষ্ট্রের জন্য বিপদ ডেকে আনে।
*দেশের অগ্রগতিতে ধ্বস*
১৯৭৫ সালের বিশ্বাসঘাতকতা যেমন দেশকে ২০ বছর পিছিয়ে দিয়েছিল, ২০২৪ সালের ঘটনাও বাংলাদেশের উন্নয়নধারাকে হঠাৎ থামিয়ে দিয়েছে।
যে দেশ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক বিস্ময় হিসেবে স্বীকৃতি পাচ্ছিল, উন্নত বিশ্বের প্রতিযোগিতায় নিজেকে প্রতিষ্ঠা করছিল, সেই দেশ আজ আবার অনিশ্চয়তার ঘূর্ণিতে পড়েছে।
জনগণ বুঝতে পারছে—এই ব্যর্থতার মূল কারণ রাষ্ট্রযন্ত্রে লুকিয়ে থাকা বিশ্বাসঘাতক উপাদান।
তারা চেনা মুখে নতুন ষড়যন্ত্র চিনে ফেলছে।
*বিশ্বাসঘাতকতার দর্শন: মুখ বদলায়, চরিত্র নয়*
জেনারেল জিয়া হোক বা জেনারেল ওয়াকার—তারা দুজনেই একই চরিত্রের দুটি ছায়া।
একজন করেছিলেন বুলেটের বিশ্বাসঘাতকতা, অন্যজন করলেন ক্ষমতার ষড়যন্ত্রে।
কিন্তু তাদের ফল এক রাষ্ট্র ক্ষতবিক্ষত, নেতৃত্বে আঘাত, মুক্তিযুদ্ধের চেতনা পদদলিত।
বিশ্বাসঘাতকরা ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে ফিরে আসে, তারা মুখ বদলায়, কিন্তু চরিত্র বদলায় না।
তাদের কাছে দেশ মানে ক্ষমতা, আর ক্ষমতা মানে ব্যক্তিস্বার্থ।
এরা বিশ্বাসের সুবাসকে বিষে পরিণত করে, রাষ্ট্রের ভিতকে নাড়িয়ে দেয়।
* রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য শিক্ষা*
জেনারেল ওয়াকারের বিশ্বাসঘাতকতা রাষ্ট্রের জন্য শুধু এক অভ্যুত্থান নয়, এটি এক গভীর শিক্ষা।
যারা অযোগ্য অথচ তোষামোদে পারদর্শী, তাদের পদোন্নতি মানে জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি।
বিশ্বাসের আসন কখনো তেলবাজদের জন্য নয়, কারণ তারা একদিন না একদিন সেই বিশ্বাসকেই অস্ত্রে পরিণত করে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বকে তাই আরও সতর্ক হতে হবে—যোগ্যতার চেয়ে চাটুকারদের পদোন্নতি যেন না হয়, কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় বিশ্বাসের ভুল নির্বাচনে।
* ইতিহাসের রায় চিরস্থায়ী*
ইতিহাসের বিচার ধীর, কিন্তু অবধারিত।
যেমন আজ জিয়া নামটি উচ্চারিত হয় বিশ্বাসঘাতকতার প্রতীকে, তেমনি সময়ের ব্যবধানে ওয়াকারের নামও লেখা থাকবে সেই একই কলঙ্কের পাশে।
ক্ষমতা ক্ষণস্থায়ী, পদ সাময়িক; কিন্তু বিশ্বাসঘাতকতার দাগ ইতিহাসে অমোচনীয়।
যে জাতি বারবার বিশ্বাসঘাতকতার শিকার, তাদের সামনে একমাত্র পথ—সচেতনতা, সততা ও নেতৃত্বে যোগ্যতার প্রতি অটল থাকা।
ইতিহাসের মঞ্চে প্রতিটি চরিত্র আসে, অভিনয় করে, তারপর হারিয়ে যায়।
কিন্তু বিশ্বাসঘাতকেরা রয়ে যায়, ইতিহাসের প্রাচীরে লেখা হয় তাদের নাম—কালো অক্ষরে।
জেনারেল জিয়া থেকে জেনারেল ওয়াকার পর্যন্ত, বাংলাদেশের ইতিহাস তাই আজও শেখাচ্ছে—
বিশ্বাসঘাতকরা হারায় না, তারা শুধু রূপ বদলায়।