নিউজ ডেস্ক :: ঢাকা–আশুলিয়া উড়ালসড়ক প্রকল্পে ব্যয় ৫৫% বৃদ্ধি এখন স্পষ্টভাবে পরিণত হয়েছে অনুমোদনের আগেই ‘হাতানোর মহোৎসবে’। যে প্রকল্পটি রাজধানী থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিপ্লব ঘটানোর কথা ছিল, তা আজ ব্যয় ফুলিয়ে তোলার পরীক্ষাগারে পরিণত হয়েছে। ২০১৭ সালে একনেক অনুমোদনের সময় ব্যয় ছিল ১৬ হাজার ৯০১ কোটি টাকা; অথচ নকশা পরিবর্তন, ডলারের দোহাই এবং নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে সর্বশেষ সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ২৩৩ কোটি টাকা। এক লাফে ৫৫ শতাংশ বৃদ্ধি—যা জনগণের ঘাড়ে চাপিয়ে দেওয়া আরেকটি অব্যাখ্যাত বোঝা ছাড়া কিছুই নয়।
নকশা পরিবর্তনের নামে যে সন্দেহজনক ব্যয়ের পাহাড় তৈরি করা হয়েছে, তা এখনই স্পষ্ট। প্রকল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিমানবন্দর–পাতাল মেট্রোরেল সংযোগ, নতুন নকশা ও ট্রাম্পেট ইন্টারচেঞ্জ যুক্ত করায় ব্যয় বেড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে যাচ্ছে—সাত বছর পর হঠাৎ এমন ‘অপরিহার্য’ পরিবর্তনের প্রয়োজন কেন দেখা দিল? কেন প্রকল্প অনুমোদন পাওয়ার আগেই ব্যয় বাড়ানো হলো ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি? নকশা পরিবর্তনের আড়ালে যে হিসাব লুকানোর প্রবণতা, অস্বচ্ছতা এবং অতিরিক্ত ব্যয়ের মাধ্যমে অর্থ হাতানোর সম্ভাবনা রয়েছে—তা প্রকল্প সংশ্লিষ্টরাও অস্বীকার করতে পারছেন না।
ডলারের মূল্যবৃদ্ধিকে ব্যয়ের প্রধান কারণ হিসেবে তুলে ধরা হলেও বাস্তবতা ভিন্ন। প্রকল্প পরিচালক জানালেও—ডলার বৃদ্ধিতে অতিরিক্ত খরচ ৩,৭৩৬ কোটি টাকা—এ বৃদ্ধি মোট ব্যয় বৃদ্ধির তুলনায় খুবই কম। তাহলে বাকি বিপুল অংকের হিসাব কোথায়? ডলার কি শুধু এই প্রকল্পের জন্যই বেড়েছে? বাজারমূল্যের সঙ্গে কি এই বৃদ্ধি সামান্যতম সঙ্গতিপূর্ণ? জনগণের মনে তাই প্রশ্ন—এটা কি সত্যিই ব্যয় বৃদ্ধি, নাকি লুকানো কোনো উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পূর্বপ্রস্তুতি?
প্রকল্পের ধীরগতি এখন আর সাধারণ গাফিলতি নয়—এটি পরিকল্পিত বিলম্বের ফল বলে মনে হচ্ছে। ২০২২ সালে কাজ শুরু হলেও তিন বছর পর অগ্রগতি মাত্র ৫৬.৫%। জাতীয় গুরুত্বের একটি মেগা প্রকল্পে এমন পিছিয়ে পড়া উন্নয়ন ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা নয়, বরং ব্যয় বাড়ানোর সুযোগ সৃষ্টি—সময়সীমা বাড়ানো, নতুন সংশোধনী আনা এবং আরও অজুহাত যোগ করার পথ সুগম করার একটি কৌশল।
জনগণের অর্থে দুর্নীতির যে একই কাহিনি বছরের পর বছর ধরে দেখা যাচ্ছে, এই প্রকল্পও তার বাইরে নয়। প্রকল্পটি শেষ হলে ২৫–৩০ জেলার মানুষের উপকার হবে—এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু যে গতিতে ব্যয় ফুলছে, তাতে আরও বড় সন্দেহ জন্মাচ্ছে—উড়ালসড়ক নির্মাণ হচ্ছে, নাকি দুর্নীতির নতুন উড়ালপথ তৈরি করা হচ্ছে? ব্যয় বাড়ানোর এই অস্বাভাবিক প্রবণতা উন্নয়ন নয়—এটি নিছক লোপাটের প্রস্তুতি বলে মনে হচ্ছে। প্রকল্প এখনও অনুমোদনের পর্যায়ে, অথচ ব্যয়ের হিসাব এমনভাবে ফুলিয়ে তোলা হয়েছে যেন অনুমোদনের আগেই ভাগ–বাঁটোয়ারার খাতা প্রস্তুত।
জনগণ জানে, ব্যয় বৃদ্ধির এই খেলা নতুন নয়। দেশের প্রায় সব মেগা প্রকল্পেই একই প্যাটার্ন—সময়সীমা বাড়ানো, ব্যয় বাড়ানো, অস্বচ্ছতা বৃদ্ধি। ঢাকা–আশুলিয়া উড়ালসড়ক প্রকল্পও সেই একই চক্রের সর্বশেষ শিকার।