দায়িত্ব পালনে অপরাধের তকমা লাগিয়ে আইনের জালে সেনাবাহিনীকে ফাঁসানো হচ্ছে

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক :: আইনের জালে সেনাবাহিনীকে ফাঁসানো হচ্ছে সরকারি দায়িত্ব পালনই যদি অপরাধ হয়, তবে আজ যারা দায়িত্বে আছেন তারাও একদিন অপরাধী হবেন*

বাংলাদেশে সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্র, আইন ও ন্যায়বিচারকে ঘিরে এক নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধের মামলা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) গুম, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রায় ৩০ জনের বিরুদ্ধে চার্জশিট ও গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঘটনায় আইন, সংবিধান ও প্রশাসনের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে কর্তব্য পালন আর অপরাধের সীমারেখা কোথায়?

*আইনি দ্বন্দ্বের সূচনা*

বাংলাদেশ সেনা আইন অনুযায়ী, দায়িত্ব পালনের সময় কোনো সামরিক কর্মকর্তা কোনো অপরাধে অভিযুক্ত হলে, তার বিচার হওয়া উচিত সেনা আইনের আওতায় কোর্ট মার্শালের মাধ্যমে। কারণ, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা সংস্থা হিসেবে সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ড মূলত “কমান্ড চেইন”-এর অধীনেই পরিচালিত হয়। কিন্তু একই অভিযোগ যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ হিসেবে আদালতে গঠিত হয়, তখন তার এখতিয়ার চলে যায় ট্রাইব্যুনালের হাতে। এই দুটি আইনি কাঠামোর মধ্যে সৃষ্ট সংঘাত এখন আলোচনার কেন্দ্রে।

সাম্প্রতিক প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ গঠনের সঙ্গে সঙ্গেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরকারি পদে অযোগ্য বিবেচিত হবেন। এতে একটি নতুন আইনি জটিলতা তৈরি হয়েছে যখন তারা সেনাবাহিনীর অংশ হিসেবেই অভিযুক্ত, তখন কীভাবে সামরিক আদালতের এখতিয়ার অগ্রাহ্য করা যায়? আইনজ্ঞদের মতে, এই ধরণের পদক্ষেপ ভবিষ্যতে সেনাবাহিনীসহ অন্যান্য শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনীর স্বাধীনতা ও দায়িত্ববোধকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

*বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা ও নৈতিক প্রশ্ন*

ন্যায়বিচার মানে শুধু অপরাধীকে দণ্ড নয়, বরং অভিযুক্তের অধিকার রক্ষা ও প্রমাণভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ। কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগেই দায়িত্ব পালনকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হলে, তা শুধু সেনাবাহিনী নয় পুরো প্রশাসনিক কাঠামোর জন্য বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়াবে।

রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনকারীরা প্রায়ই কঠিন ও সংবেদনশীল সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হন। সেই সিদ্ধান্তের ফলাফল নিয়ে পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রেক্ষাপটে অভিযোগ উঠতে পারে। কিন্তু সেই অভিযোগের বিচার হওয়া উচিত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে, রাজনৈতিক প্রতিশোধ নয়।

আইনের প্রয়োগ যদি বাছাই করে করা হয়, তবে রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোই দুর্বল হয়ে পড়ে। ন্যায়বিচার তখন রূপ নেয় প্রতিশোধে, এবং প্রশাসন হারায় পেশাগত সাহস।

এই দ্বন্দ্বের সমাধান রাজনৈতিক বক্তব্য বা প্রশাসনিক নির্দেশে নয়, বরং আইনি প্রক্রিয়া ও সংবিধানসম্মত পদ্ধতির মধ্য দিয়েই আসতে হবে।

অভিযোগ ওঠার সঙ্গে সঙ্গে সেনা ও বেসামরিক উভয় পক্ষের প্রতিনিধিত্বে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠন করা উচিত, যাতে তথ্য, প্রমাণ ও সাক্ষ্য যাচাই হয় নিরপেক্ষভাবে।

যেখানে অভিযোগ দায়িত্বপালনের সঙ্গে সম্পর্কিত, সেখানে কোর্ট মার্শালের প্রক্রিয়া অগ্রাধিকার পাবে; আর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের ভূমিকা থাকতে পারে সহযোগিতামূলক পর্যায়ে।

রাষ্ট্রের শক্তি অস্ত্র বা ক্ষমতায় নয় ন্যায়ের মানদণ্ডে। সেনা কর্মকর্তা, আমলা বা রাজনীতিক সবাই আইনের অধীন, কিন্তু আইনের প্রয়োগ হতে হবে ন্যায় ও প্রেক্ষাপটনির্ভর। দায়িত্ব পালনের সময় কোনো সিদ্ধান্ত বা অভিযানকে অপরাধ হিসেবে দেখা হলে, আজ যারা দায়িত্বে আছেন তাদেরও একদিন একই ফাঁদে পড়তে হতে পারে।

বাংলাদেশের সংবিধান বলছে, ন্যায়বিচার হবে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও মানবিক। তাই আজ প্রয়োজন প্রতিহিংসা নয় প্রমাণ, প্রক্রিয়া ও প্রজ্ঞার আলোকে এগোনো।
কারণ, ন্যায় যদি নতি স্বীকার করে তাহলে রাষ্ট্রও টিকবে না, বিচারও নয়।