নিউজ ডেস্ক :: “নতুন বাংলাদেশ” এই আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে ছিল একটি নির্দিষ্ট প্রতিশ্রুতি: বৈষম্যমুক্ত প্রশাসন ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা। কিন্তু দেড় বছরের ব্যবধানে যে চিত্র ফুটে উঠেছে, তা জনমানসে উদ্বেগ, ক্ষোভ ও হতাশা বাড়িয়ে তুলেছে। নিয়োগ–বদলি বাণিজ্য থামেনি; বরং অভিযোগ মতে এটি আরও সুসংগঠিত ও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় পরিণত হচ্ছে। এরই সঙ্গে বিতর্কের কেন্দ্রে উঠে এসেছে দুর্নীতি দমন কমিশন যাকে অনেকেই এখন বাস্তবে “দুর্নীতির রক্ষক” হিসেবে অভিযুক্ত করছেন।
*উচ্চপদে পদায়নে অনিয়মের ঘনঘন অভিযোগ*
সচিব পর্যায়ে পদোন্নতি থেকে শুরু করে জেলা প্রশাসক নিয়োগ পর্যন্ত নানা গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তকে ঘিরে অনিয়মের অভিযোগে প্রশাসন উত্তপ্ত। ঘুষের চেক ফাঁস হওয়া, বদলি বাণিজ্যের টাকার অঙ্ক প্রকাশ পাওয়া এবং এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বদলি সব মিলিয়ে শাসনব্যবস্থার শুদ্ধতার প্রতিশ্রুতিতে জনগণের আস্থা নড়বড়ে হয়েছে।
*চট্টগ্রাম প্রশাসন: বড় ধরনের বাণিজ্যের অভিযোগ*
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক পদায়নকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও বিস্ফোরক করে তোলে। অভিযোগ অনুসারে, বদলি বাণিজ্যের বিশাল অঙ্কের লেনদেন হয়েছে, যার প্রভাবে জনপ্রশাসন সচিব পর্যন্ত সরিয়ে দিতে হয়েছে। একই ঘটনায় এপিডিকেও দায়িত্ব থেকে অপসারণ করা হয়। এসব ঘটনা প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে দুর্নীতির গভীরতা বোঝায়।
*স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে অস্বাভাবিক বদলির বন্যা*
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একযোগে হাজারো বদলি, যোগদান এড়িয়ে ঢাকায় প্রভাবশালী চিকিৎসকদের ধরে রাখা, মাঠপর্যায়ে চিকিৎসক সংকট সব মিলিয়ে স্বাস্থ্যখাতেও অভিযোগের পরিমাণ কম নয়। গোয়েন্দা রিপোর্টে বদলি সংক্রান্ত আর্থিক লেনদেনের উল্লেখ থাকায় বিষয়টি আরও আলোচিত হয়।
*বিভাগীয় প্রশাসন থেকে শিক্ষা বিভাগ—সবখানেই একই চিত্র*
ময়মনসিংহ, খুলনা, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন অঞ্চলে মাঠ প্রশাসনের বদলি নিয়ে ওঠা অভিযোগে প্রশাসনিক বিশৃঙ্খলা স্পষ্ট। শিক্ষা বিভাগেও শত শত শিক্ষক বদলির ঘুষ ভাগাভাগির অভিযোগ একজন উপপরিচালক ও তার পিএ কে ঘিরে—জনমনে ক্ষোভ বাড়িয়েছে।
পুলিশেও গুরুত্বপূর্ণ থানার ওসি ও কর্মকর্তাদের বদলিতে রাজনৈতিক সুপারিশের আড়ালে লেনদেনের অভিযোগ দীর্ঘদিনের হলেও নতুন বাংলাদেশেও এই চিত্র পরিবর্তিত হয়নি।
*বন বিভাগে দশ কোটি টাকার বাণিজ্যের অনুসন্ধান*
চট্টগ্রামে ৭৭ জন বন কর্মকর্তার একযোগে বদলিতে মোটা অঙ্কের টাকার অভিযোগ তদন্ত করছে দুদক। কিন্তু এখানেও একটি প্রশ্ন জোরালোভাবে উঠে এসেছে দুদক কি সত্যিই নিরপেক্ষ ভূমিকা রাখছে, নাকি তদন্তও রাজনৈতিক–প্রশাসনিক প্রভাবের অধীনে?
*‘দুদক এখন দুর্নীতির রক্ষক’ জনমতের অভিযোগ*
দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রতি আস্থা এখন আগের মতো নেই এ কথা বিভিন্ন মহলে জোরালোভাবে শোনা যাচ্ছে।
অনেকেই অভিযোগ করছেন, দুদক এখন কার্যত প্রশাসনিক স্বার্থ রক্ষায় ব্যবহৃত একটি সংস্থা; বড় দুর্নীতিবাজরা থেকে যাচ্ছে নিরাপদে, অথচ ছোটখাটো মামলায় জনদৃষ্টি ঘোরানো হচ্ছে।
সমালোচকদের মতে, দুদক কাঠামোগত স্বাধীনতা পেলেও তার কার্যক্রমে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব স্পষ্ট, এবং এর ফলেই “রক্ষকের ভূমিকায় রক্ষাকর্তা পরিণত হয়েছে রক্ষকের ভূমিকায়”—এমন মন্তব্য জনমনে স্থান করে নিয়েছে।
*নতুন বাংলাদেশের সংকট দুর্নীতি পুরোনো ধারায় ফিরে যাওয়া*
দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণার পরও দেড় বছরে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্যে কোনো মৌলিক পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং অভিযোগ ও অনিয়মের বিস্তার প্রমাণ করে প্রশাসনের ভেতর পুরোনো শক্তিগুলো অটুট রয়েছে।
জনমতের অভিযোগ অনুযায়ী দুদক যখন দুর্নীতিকে দমন করার বদলে দুর্নীতির প্রতিবন্ধকতা দূর করে, তখন নতুন বাংলাদেশ গড়ার প্রতিশ্রুতিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।