নিউজ ডেস্ক :: বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আজ এক সংবেদনশীল মোড়ে দাঁড়িয়ে। সাগরে অনুসন্ধানে একের পর এক ব্যর্থতার পর এবার অন্তর্বর্তী সরকার স্থলভাগের গ্যাস ব্লক বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। বিষয়টি শুধু অর্থনৈতিক নয়, বরং রাজনৈতিক ও নীতিগতভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—কারণ এর প্রভাব পড়বে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্বালানি নিরাপত্তা ও জাতীয় সার্বভৌমত্বের ওপর।
বিগত সরকারের সময় স্থলভাগের গ্যাস ব্লক বিদেশিদের না দেওয়ার যে নীতিগত সিদ্ধান্ত ছিল, তা মূলত জাতীয় স্বার্থ ও কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার উদ্দেশ্যেই গৃহীত হয়েছিল। গ্যাস কোনো সাধারণ বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি একটি দেশের সার্বভৌমত্ব, স্বনির্ভরতা ও উন্নয়ন সম্ভাবনার প্রতীক। এখন সেই নীতির পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে সরকার যে পথে এগোচ্ছে, তা একাধিক প্রশ্ন তোলে: এই চুক্তি কি সত্যিই জাতীয় স্বার্থে, নাকি তাৎক্ষণিক অর্থনৈতিক সুবিধা বা আন্তর্জাতিক চাপের ফল?
স্থলভাগের গ্যাস ব্লক ইজারা দেওয়ার অর্থ হলো জাতীয় ভূসম্পদের মালিকানার একটি অংশ বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দেওয়া। এতে দেশীয় সক্ষমতা, বিশেষ করে বাপেক্সের মতো প্রতিষ্ঠান, আরও দুর্বল হয়ে পড়বে। অথচ গত দুই দশকে বারবার বলা হয়েছে—প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও আর্থিক সহায়তা দিলে বাপেক্স নিজস্বভাবে অনুসন্ধান পরিচালনা করতে সক্ষম।
আরেকটি উদ্বেগের জায়গা হলো সময়কাল। নির্বাচনের আগমুহূর্তে এমন গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি সম্পাদন রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হয়ে উঠতে পারে। কারণ, একটি অন্তর্বর্তী সরকারের মূল দায়িত্ব প্রশাসনিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখা—নতুন নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়।
নীতিনির্ধারক ও অর্থনীতিবিদদের অনেকেই মনে করেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ—বিশেষ করে বন্দর ও জ্বালানি খাতে—বিদেশি বিনিয়োগের নামে ধারাবাহিক চুক্তির প্রবণতা দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এসব চুক্তির আর্থিক কাঠামো, কমিশন বণ্টন ও প্রকৃত লাভের পরিমাণ নিয়েও জনমনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
রাষ্ট্রীয় সম্পদের প্রকৃত মালিক জনগণ। তাই উৎপাদন-বণ্টন চুক্তি (PSC) সম্পাদনের আগে সংসদীয় অনুমোদন, স্বচ্ছ দরপত্র প্রক্রিয়া ও গণমাধ্যমের স্বাধীন নজরদারি থাকা জরুরি। জাতীয় সম্পদ নিয়ে গোপনে সিদ্ধান্ত নেওয়া গণতন্ত্র ও জবাবদিহির চেতনাকে দুর্বল করে।
গ্যাস খাতের ইতিহাস প্রমাণ করেছে—একটি ভুল সিদ্ধান্তের মূল্য জাতিকে দীর্ঘদিন দিতে হয়। এখন প্রয়োজন রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, অর্থনৈতিক দূরদৃষ্টি, এবং সবচেয়ে বেশি—জনগণের সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার নিশ্চিত করা।
জাতীয় সম্পদ কোনো সরকারের নয়—এটি জনগণের আমানত। তাই প্রতিটি সিদ্ধান্ত হতে হবে স্বচ্ছ, ন্যায়সঙ্গত ও সংবিধানসম্মত।