ধর্মীয় মুখোশে নারী শাসনের বিরোধিতা—এটাই সাম্প্রদায়িকতা,পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ

লেখক: সুমিত বিশ্বাস
প্রকাশ: ১ সপ্তাহ আগে

দিনপত্র ডেস্ক :: ক্ষমতার ইতিহাস মানেই পুরুষতন্ত্রের ইতিহাস এ কথা বললে খুব বেশি ভুল হবে না। পরিবার থেকে রাষ্ট্র, ধর্ম থেকে রাজনীতি, অর্থনীতি থেকে সংস্কৃতি—সবখানেই দীর্ঘদিন ধরে এমন এক কাঠামো প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যেখানে পুরুষকে কেন্দ্র আর নারীকে প্রান্তে রাখা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশসহ বিশ্বের বহু দেশে এই চিত্র দ্রুত বদলেছে। নারী আজ কেবল ভুক্তভোগী নন তিনি নেতা, সিদ্ধান্ত-নির্মাতা ও রাষ্ট্র পরিচালনার অংশীদার। তবু পুরুষতন্ত্র নতুন রূপে টিকে থাকার চেষ্টা করছে কখনো সামাজিক রীতির আড়ালে, কখনো বিকৃত ধর্মীয় ব্যাখ্যায়, কখনো রাজনৈতিক কৌশলে।
সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে উদ্বেগজনক প্রবণতা হলো ধর্মীয় মুখোশে নারী শাসনের বিরোধিতা। কিছু ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক গোষ্ঠী দাবি করে, নারী রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে না। কিন্তু এটি ধর্ম নয় এটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সাম্প্রদায়িকতা। ধর্মকে ঢাল বানিয়ে নারীকে ক্ষমতা থেকে দূরে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা মানে সমাজকে পিছিয়ে নেওয়া এবং গণতন্ত্রকে দুর্বল করা।

বাংলাদেশের বাস্তবতাই এই সংকীর্ণ যুক্তিকে মিথ্যা প্রমাণ করে। শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়া—দুই নারী—দীর্ঘ সময় ধরে দেশের সরকারপ্রধান ছিলেন। তাদের নেতৃত্বে অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও সামাজিক নিরাপত্তা খাতে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়েছে। নারী শিক্ষা বিস্তার, দারিদ্র্য হ্রাস ও বৈশ্বিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী হয়েছে। তাই নারী নেতৃত্বকে অস্বীকার করা মানে ইতিহাসকে অস্বীকার করা।

জামায়াত ইসলামসহ কিছু ধর্মভিত্তিক দল আজও নারী নেতৃত্ব মানতে চায় না। তারা নারীকে ঘরে সীমাবদ্ধ রাখতে চায় এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় পুরুষের একচ্ছত্র আধিপত্য ফিরিয়ে আনতে চায়। এটি ধর্মীয় নীতি নয় এটি ক্ষমতা দখলের কৌশল। কারণ নারীকে বাদ দিলে গণতন্ত্র অপূর্ণ থাকে এবং সমাজ তার অর্ধেক শক্তি হারায়।
নারী ক্ষমতায়ন মানে শুধু শিক্ষা নয়—সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। নিজের শরীর, শ্রম, ভোট ও ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্বাধীন সিদ্ধান্ত নেওয়াই প্রকৃত ক্ষমতায়ন। অথচ বাস্তবে নারীকে প্রায়ই দ্বিগুণ পরিশ্রম করেও কম স্বীকৃতি পেতে হয়। নেতৃত্বে থাকা নারীকে “কঠোর” বা “অহংকারী” বলা হয় যা পুরুষ নেতাদের ক্ষেত্রে খুব কমই শোনা যায়।

আজ নারী সর্বত্র—শিক্ষা, প্রযুক্তি, রাজনীতি, ব্যবসা, এমনকি সামরিক বাহিনীতেও। তবু কিছু মানসিকতা নারীকে “আঁচলের ভেতর” দেখতে চায় ভোট দেবে, কিন্তু নেতৃত্ব দেবে না। এটাই আধুনিক পুরুষতন্ত্রের দ্বৈত মানদণ্ড।

বাংলাদেশে নারী ভোটার সংখ্যা পুরুষের সমান বা বেশি। তবু সংসদ ও স্থানীয় সরকারে নারীর প্রতিনিধিত্ব এখনও ন্যায্য নয়। সমস্যাটা নারীর যোগ্যতায় নয় সমস্যা কাঠামোগত বৈষম্য ও পুরুষতান্ত্রিক রাজনীতিতে।
আরেকটি বড় সমস্যা হলো নারী নেতৃত্বের অবমাননা। পোশাক, কণ্ঠ বা পরিবার দিয়ে নারী নেত্রীকে বিচার করা এক ধরনের কাঠামোগত সহিংসতা। এই সংস্কৃতি ভাঙা না গেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেয়েরা নেতৃত্বে আসতে নিরুৎসাহিত হবে।

পুরুষতন্ত্র লিঙ্গের সমস্যা নয়, ক্ষমতার সমস্যা। এই লড়াই পুরুষ বনাম নারী নয় এটি অন্যায় ক্ষমতার কাঠামোর বিরুদ্ধে সংগ্রাম। অনেক নারীও পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতা বহন করেন পুত্রকে অগ্রাধিকার দেন, মেয়ের স্বাধীনতা সীমিত করেন। তাই পরিবর্তন চাইলে চিন্তার কাঠামো বদলাতে হবে।
পুরুষতন্ত্র ভাঙা মানে পুরুষকে হারানো নয় অন্যায় ক্ষমতার কাঠামো ভাঙা। ধর্মের নামে নারী শাসনের বিরোধিতা আসলে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি। বাংলাদেশ নারী নেতৃত্বে এগিয়েছে, এগোচ্ছে এবং এগোবে।
সমতাভিত্তিক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ গড়তে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ গড়ে তোলাই সময়ের দাবি।