বিশেষ প্রতিনিধি | ঢাকা
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসনিক শাখায় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী ও সুসংগঠিত নিয়ন্ত্রণ বলয় এখন প্রশ্নের মুখে। একাধিক সূত্র, নথিপত্র এবং চলমান তদন্তে দেখা যাচ্ছে—পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এবি এম আবু হানিফের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নিয়োগ, টেন্ডার এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি স্থায়ী রূপ পেয়েছে।
*কুষ্টিয়ায় নিয়োগ কেলেঙ্কারি: ডা. আনোয়ারুল কবিরের ভূমিকা*
ডা. আনোয়ারুল কবির, পরিচালক, কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, একসময় স্বাচিপের উত্তরাঞ্চলের প্রভাবশালী নেতার ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সূত্রমতে, সেই রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের সহায়তায় তিনি স্বাস্থ্য বিভাগের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে ওঠেন এবং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষমতার অনুকূলে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করেন।
২০২৩ সালে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজে ১১–২০ গ্রেডের কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষায় অভিযোগ আসে—নির্দিষ্ট প্রার্থীদের একটি বিশেষ কক্ষে বসিয়ে পরীক্ষা নেওয়া হয় এবং প্রশ্ন আগেই সরবরাহ করা হয়। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসলে জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। সাময়িকভাবে নিয়োগ কার্যক্রম স্থগিত হলেও, দুদকের অনুসন্ধান চলমান থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ প্রক্রিয়া শেষ করা হয়।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক সূত্রের দাবি, ডা. আনোয়ারুল কবির এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পরিচালকের নির্দেশ ও পরামর্শ পেয়েছিলেন। পরবর্তীতে কুষ্টিয়া সিভিল সার্জন কার্যালয়ের অন্য একটি নিয়োগ পরীক্ষায় নির্ধারিত প্রার্থীদের পরীক্ষা সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসারের বাসায় নেওয়ার সময় গণমাধ্যমকর্মীদের হাতে ধরা পড়েন সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনাতেও দুদকের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয়ে যোগ্য ও নিয়মিত পরিচালক পদায়ন না থাকায় প্রায় দেড় ডজন কর্মকর্তা দীর্ঘদিন কার্যত নিষ্ক্রিয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পরিচালক বলেন,
“প্রশাসনিক সুনাম থাকা সত্ত্বেও বছরের পর বছর কোনো গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পাচ্ছি না।”
*রাজশাহী বিভাগে ই-জিপি নিয়ন্ত্রণ,ডা. হাবিবুর রহমান ও অফিস সহকারী সাইফুল*
৩০ ডিসেম্বর ২০২৩ সালে ডা. এবি এম আবু হানিফ রংপুর বিভাগের বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) হিসেবে যোগ দেন। সেই সময় তার অধীনে উপপরিচালক ছিলেন ডা. মো. হাবিবুর রহমান, যিনি বর্তমানে রাজশাহী বিভাগের পরিচালক (স্বাস্থ্য) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
সূত্র অনুযায়ী, ডা. হাবিবুর রহমানের প্রশাসনিক পদক্ষেপ রাজশাহী বিভাগের স্বাস্থ্যখাতকে দুর্নীতি ও ব্যর্থতার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করেছে। ৮ জেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে আসা ই-জিপি (e-GP) টেন্ডারের প্রশাসনিক অনুমোদন সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক, যেখানে এডমিন আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে টেন্ডারের সব নথি যাচাই-বাছাই করার বিধান রয়েছে।
তবে অভিযোগ রয়েছে—ডা. হাবিবুর রহমান তার অফিসের অফিস সহকারী ও কম্পিউটার অপারেটর মো. সাইফুল ইসলামের কাছে এই আইডি-পাসওয়ার্ড হস্তান্তর করেন। এর ফলে ৮ জেলার টেন্ডার প্রক্রিয়ায় মো. সাইফুল ইসলাম একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন। একাধিক সূত্রে জানা গেছে, এই প্রক্রিয়ায় সংগৃহীত উৎকোচের একটি বড় অংশ ডা. হাবিবুর রহমানের মাধ্যমে পরিচালক (প্রশাসন) ডা. এবি এম আবু হানিফের নিকট পৌঁছেছে।
ডা. হাবিবুর রহমানকে প্রশাসনিকভাবে অদক্ষ ও প্রযুক্তি জ্ঞানহীন হিসেবে দেখানো হলেও, এই পদক্ষেপে ১৬ গ্রেডের একজন কর্মচারী পুরো বিভাগের ‘টেন্ডার মাফিয়া’তে পরিণত হন। এর আগে আফজাল ও রুবিনা দম্পতির বিরুদ্ধে প্রায় ২,৩০০ কোটি টাকা অস্ট্রেলিয়ায় পাচারের তথ্য প্রকাশিত হওয়ার পর সরকার ব্যবস্থা নিতে বাধ্য হয়।
এতে প্রশ্ন ওঠে—সাইফুল ইসলাম কি সেই পর্যায়ে পৌঁছানো না পর্যন্ত অদৃশ্যই থেকে যাবে?
*চাঁপাইনবাবগঞ্জে টেন্ডার ম্যানিপুলেশন: ডা. মাসুদের অপসারণ*
ডা. মাসুদ, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে দীর্ঘদিন একচ্ছত্র কর্তৃত্ব বজায় রেখেছিলেন। স্থানীয়ভাবে তিনি পরিচালক ডা. এবি এম আবু হানিফের ‘মাইম্যান’ হিসেবে পরিচিত।
২০২৫–২৬ অর্থবছরের মেডিকেল ও সার্জিক্যাল রিকুইজিট টেন্ডার প্রক্রিয়া মূল্যায়নের সময় তার টেন্ডার ম্যানিপুলেশন মন্ত্রণালয়ের নজরে আসে। একদিনের সময়সীমা বেঁধে তাকে বদলি করা হয় এবং ডা. মসজিউর রহমানকে নতুন তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে ডা. আবু হানিফের সম্পর্কের অবনতি ঘটলেও, দীর্ঘদিনের সিন্ডিকেটের শক্তি তাকে এখনো স্বপদে বহাল রেখেছে।
*বিস্তৃত সিন্ডিকেট বলয়*
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একাধিক সূত্র জানায়, ডা. আবু হানিফের নিয়ন্ত্রণ বলয়ে রয়েছেন—
ডা. মুহা. রুহুল আমিন, সহকারী পরিচালক (প্রশাসন), রাজশাহী
ডা. মো. আমিনুল ইসলাম, সিভিল সার্জন, নওগাঁ
ডা. মো. আখতারুজ্জামান, উপপরিচালক, রংপুর মেডিকেল কলেজ
গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রামের সিভিল সার্জন
সহকারী পরিপালক (প্রশাসন) ডা. জমাদ্দার
উচ্চমান সহকারী জিয়াউর রহমান, আমিনুল ইসলাম
প্রধান সহকারী জালাল উদ্দিন
ব্যক্তিগত সহকারী মো. আবুল কালাম আজাদ
এই বলয়ের কার্যক্রমে প্রায় শতাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে।
*পদায়ন ও বদলির অস্থিরতা*
স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায় সবচেয়ে বড় আতঙ্ক হলো পদায়ন ও বদলী। নক্ষত্র অনুযায়ী ছোট ও মধ্যপদে কর্মরত স্বাস্থ্যের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পদায়ন জৈষ্ট করা হচ্ছে। গত বছরে ৭০% বদলী আদেশ প্রতিপালিত হয়নি। একই আদেশ পুনঃবিবেচনা নামে বারবার অন্য কর্মকর্তাকে প্রতিস্থাপন করা হচ্ছে। ফলে স্বাস্থ্য সেবা খাতে নজিরবিহীন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, হাজারো স্বাস্থ্যকর্মী বিভিন্ন দাবিতে কর্মসূচিতে অংশ নিচ্ছেন। মন্ত্রণালয়ের মাননীয় উপদেষ্টা, বিশেষ সহকারী ও দুই বিভাগের সচিবসহ উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তা স্বাস্থ্য প্রশাসনে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হচ্ছেন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে এ ধরনের সিন্ডিকেট কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়—এটি সরাসরি জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির সঙ্গে সম্পর্কিত। প্রশ্ন উঠে, এই অদৃশ্য বলয় ভাঙবে কে?
এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির মূল্য সাধারণ মানুষের জন্য কতটা ভারী হবে?