১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬; বাংলাদেশের রাজনৈতিক ক্যালেন্ডারে এই তারিখটি কেবল একটি সাধারণ নির্বাচনের দিন হিসেবে নয়, বরং গণতন্ত্রের কফিনে শেষ পেরেক ঠোকার একটি কলঙ্কিত মুহূর্ত হিসেবে ইতিহাসের পাতায় খোদাই করা থাকবে। মহান মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে রাজনৈতিক ময়দান ও নির্বাচনের বাইরে রেখে ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অসাংবিধানিক অন্তর্বর্তীকালীন সরকার যে একতরফা ও সাজানো প্রহসনের আয়োজন করেছিল, তা এদেশের সচেতন জনতা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করেছে। এই নির্বাচন কোনোভাবেই জনগণের ম্যান্ডেট অর্জনের প্রক্রিয়া ছিল না, এটি ছিল একটি আইনি লেবাস পরিয়ে অবৈধ সরকারের অনুগত ও সহযোগীদের ক্ষমতার মসনদে বসানোর এক নির্লজ্জ মহড়া। পুরো জাতির সামনে নির্বাচনের নামে যে নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে, তা প্রকারান্তরে দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামোকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দিয়েছে এবং রাষ্ট্রকে এক অনিশ্চিত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দিয়েছে।
বাংলার মানুষের আস্থার প্রতীক হিসেবে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দীর্ঘ পথচলা এবং এর জনসমর্থনের গ্রাফ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এদেশের মাটি ও মানুষের সাথে এই দলের শিকড় কতটা গভীরে প্রোথিত। ১৯৭৫ সালের ট্র্যাজেডির পর দীর্ঘ নির্বাসন শেষে ১৯৮১ সালে যখন বঙ্গবন্ধু তনয়া শেখ হাসিনা দেশে ফিরেছিলেন, তখন তিনি খণ্ড বিখণ্ড আওয়ামী লীগকে আদর্শিক ঐক্যের সুতোয় গেঁথেছিলেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে দীর্ঘ সময় ক্ষমতার বাইরে থাকার পরেও কেবল আদর্শের টানে মানুষ আওয়ামী লীগকে বিপুল ভোট দিয়েছিল, যার হার ছিল ৩০.১%। পরবর্তীতে ১৯৯৬ সালের ১৫ই ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকারের সেই প্রহসনের নির্বাচনের বিরুদ্ধে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে যে তীব্র গণআন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তারই ধারাবাহিকতায় ১২ই জুনের নির্বাচনে ৩৭.৪% ভোট পেয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ মেয়াদে শেখ হাসিনার সরকারই বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম পূর্ণ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করে শান্তিপূর্ণভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করে এক অনন্য গণতান্ত্রিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। ২০০১ সালের নির্বাচনে গভীর আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে ক্ষমতার বাইরে রাখা হলেও, দলটির জনসমর্থন বা ভোটের হার ছিল ৪০.০২%, যা ছিল বিজয়ী জোটের একক ভোটের হারের চেয়েও বেশি।
২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত বিএনপি জামায়াত জোটের বিভীষিকাময় দুঃশাসন এবং বিশেষ করে ২০০৪ সালের ২১শে আগস্ট শেখ হাসিনার ওপর বর্বরোচিত গ্রেনেড হামলার প্রতিবাদে ২০০৮ সালের নির্বাচনে বাংলার মানুষ আবারো আওয়ামী লীগের ওপর পূর্ণ আস্থা রাখে। ৪৮.০৪% ভোট এবং দুই তৃতীয়াংশ আসন নিয়ে গঠিত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার বাংলাদেশকে উন্নয়নের এক অভাবনীয় উচ্চতায় নিয়ে যায়। টানা ১৫ বছরের শাসনামলে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো মেগা প্রকল্প এবং অভাবনীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি জনমনে এই অটল বিশ্বাস গেঁথে দিয়েছিল যে শেখ হাসিনার হাতেই নিরাপদ বাংলাদেশ। ডিজিটাল বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট বাংলাদেশ অভিমুখে রূপান্তর এদেশের যুবসমাজের জন্য যে দিগন্ত উন্মোচন করেছিল, তা ড. ইউনূসের শাসনামলে সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ হয়ে গেছে।
সেই গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত সরকারকে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট এক মেটিকুলাস ডিজাইনের মাধ্যমে কালার রেভ্যুলেশনের মাধ্যমে রেজিম চেঞ্জ ঘটিয়ে অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতা থেকে সরানো হয়। ড. ইউনূসের নেতৃত্বে ক্ষমতা দখলকারী এই গোষ্ঠী এরপর শুরু করে এক নজিরবিহীন দমন পীড়ন। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ এবং সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের ওপর যে অকথ্য ও নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা সভ্য সমাজের কল্পনাকেও হার মানায়। হাজার হাজার নেতাকর্মীকে বিনা বিচারে আটক রাখা, বিনা চিকিৎসায় জেলখানায় মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে অসংখ্য নেতাকর্মীকে। এমনকি কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর শিক্ষার মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়েছে কেবল ছাত্রলীগে সম্পৃক্ত থাকার অজুহাতে। ড. ইউনূসের শাসনামলে দেশ পরিচালনায় প্রশাসনিক ব্যর্থতার কারণে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পুরোপুরি ভেঙে পড়ে এবং দেশজুড়ে মব সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে।
সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের বীর সেনানিদের অপমান ও অবমাননা। রাষ্ট্রীয় সহযোগিতায় ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের সেই স্মৃতিবিজড়িত বাড়ি গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং মুক্তিযোদ্ধাদের গলায় জুতোর মালা পরানোর মতো যে কলঙ্কজনক ঘটনাগুলো ঘটেছে, তা বাংলাদেশের মানুষ অশ্রুসিক্ত চোখে প্রত্যক্ষ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভগুলো যখন ভেঙে ফেলা হচ্ছিল, তখন এদেশের দেশপ্রেমিক মানুষের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হয়েছে। মহান মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী জামায়াত শিবিরের নেতাকর্মীদের কিংবা জঙ্গি গোষ্ঠীদের উত্থান দেশবাসী লক্ষ্য করেছে। ইউনূস সরকারের আমলে এই নৈরাজ্য, দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি এবং সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা না থাকা দেখে মানুষ যখন বলতে শুরু করল আগেই ভালো ছিলাম, তখন আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে কয়েক গুণ বেড়ে যায়। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে এবং আওয়ামী লীগ নির্বাচনে এলে বিপুল ভোটে জয়ী হবে এই ভয়ে ভীত হয়ে ড. ইউনূসের দখলদার সরকার অসাংবিধানিকভাবে দলটির ওপর নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ আরোপ করে। মূলত স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া দলটিকে মাঠের বাইরে রেখেই ১২ই ফেব্রুয়ারির এই একতরফা নির্বাচনের ছক আঁকা হয়েছিল।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা যখন ভার্চুয়াল বার্তায় নির্দেশ দিলেন, “যেই ব্যালটে নৌকা নেই, সেই ব্যালটে আমাদের নেতাকর্মীরা কেউ ভোট দিতে যাবে না”, তখন কেবল দলীয় কর্মী নয়, বরং দেশের বিশাল এক অংশ সাধারণ মানুষ ভোট বর্জনের সিদ্ধান্তে অটল থাকে। নির্বাচনের দিন সকাল থেকেই ভোটকেন্দ্রগুলোর চিত্র ছিল জনমানবহীন। গণমাধ্যমে প্রকাশিত ভিডিও ও স্থিরচিত্রে দেখা গেছে খাঁ খাঁ করা বুথ এবং অলস সময় কাটানো নির্বাচনী কর্মকর্তাদের। এমনকি অনেক কেন্দ্রে কুকুর ঘুমাচ্ছে এমন দৃশ্যও ইন্টারনেটে ভাইরাল হয়েছে। বাংলাদেশের নির্বাচনী বাস্তবতায় সাধারণত দুপুরের আগেই অধিকাংশ ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করেন। অথচ এই জনশূন্য নির্বাচনের পর দুপুর ১২টায় যখন বলা হলো ভোট পড়ার হার ৩২.৮৮%, তখন তা ছিল চরম হাস্যকর ও বাস্তবতাবিবর্জিত। বিকেলের মধ্যে এই সংখ্যাকে জাদুকরীভাবে বাড়িয়ে জনসম্মুখে প্রচার করা হয়, যা কেবল নির্লজ্জ মিথ্যাচার ছাড়া আর কিছু নয়। প্রিজাইডিং অফিসারদের আগেই সই করা রেজাল্ট শিট ঝিনাইদহসহ বিভিন্ন জেলায় নির্বাচনের আগের রাতেই গণমাধ্যমে চলে আসে। এই জালিয়াতিই প্রমাণ করে যে ফলাফল আগেই নির্ধারিত ছিল এবং নির্বাচন ছিল স্রেফ একটি সাজানো নাটক। জনগণের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে ড. ইউনূসের অবৈধ সরকার যে তার সহযোগীদের ক্ষমতায় বসিয়েছে তা আজ বিশ্বের দরবারেও স্পষ্ট। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকরা এই নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং দেশের মানুষ এই নির্বাচনের ফলাফলকে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করেছে। ১২ই ফেব্রুয়ারি সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন স্থানে জাল ভোট দেওয়ার মহোৎসব শুরু হয়েছিল যা অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমও প্রচার করেছে।
বিগত নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগের একক ভোটের হার ছিল গড়ে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশের মধ্যে। ড. ইউনূসের শাসনামলে যে দুঃসহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তাতে অন্তত ৬০ শতাংশ মানুষ আওয়ামী লীগের সমর্থনে এই প্রহসনের নির্বাচন বর্জন করে ঘরে বসে ছিল। আওয়ামী লীগের শাসনামলে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বাংলাদেশ কে সমুন্নত রাখা, উন্নয়ন আর সুশাসনে যে আস্থা অর্জিত হয়েছিল, তা ফ্যাসিস্ট ড. ইউনূসের শাসনামলে আরও দৃঢ় হয়েছে। জনগণ বুঝতে পেরেছে যে উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা এবং উগ্রবাদ রুখতে আওয়ামী লীগের বিকল্প নেই।
১২ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬ এর এই তামাশার নির্বাচন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক জ্বলন্ত প্রমাণ হিসেবে থাকবে যে, আওয়ামী লীগকে ছাড়া এদেশের কোনো নির্বাচনই বৈধতা পায় না। ইউনূসের অবৈধ দখলদার সরকার এবং তার সহযোগীরা শত চেষ্টা ও ভয় ভীতি দেখানোর পরেও সাধারণ জনগণকে প্রহসনের নির্বাচনে সম্পৃক্ত করতে পারেনি। পারেনি জনমানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগের নাম মুছে ফেলতে। বরং প্রতিটি নির্যাতন আর বঞ্চনার ঘটনা আওয়ামী লীগকে জনগণের আরও কাছে নিয়ে গেছে। ১২ই ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচন বর্জনই প্রমাণ করে যে দেশের মানুষ গণতন্ত্রের সাথে কোনো আপোষ করবে না এবং তারা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলায় ফেরার।