নিউজ ডেস্ক ::২০২৫ সালের অক্টোবরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ১৫ জন কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার ও তাৎক্ষণিকভাবে বরখাস্ত করা হয়। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কোনো আদালতের রায় ছাড়াই কেবল অভিযোগের ভিত্তিতে সক্রিয় সেনা কর্মকর্তাদের পদচ্যুত করা—এক নজিরবিহীন ঘটনা।
এই সিদ্ধান্তের আইনি ভিত্তি তৈরি হয় ১০ অক্টোবর রাষ্ট্রপতি জারি করা “আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) (দ্বিতীয় সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫”–এর মাধ্যমে। এই অধ্যাদেশে নতুন ধারা ৯ক যুক্ত হয়, যা অভিযোগ দায়েরের পরই সরকারি বা সামরিক কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার ক্ষমতা দেয়। অর্থাৎ অভিযোগই এখন বরখাস্তের কারণ হতে পারে, রায়ের অপেক্ষা ছাড়াই।
তবে এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের প্রচলিত আইনি রীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ১৯৮৫ সালের “সরকারি কর্মচারী (দণ্ডাদেশ পেলেই বরখাস্ত) অধ্যাদেশ” অনুযায়ী, কেবল আদালতে দোষী সাব্যস্ত হলেই বরখাস্ত করা যেত। অর্থাৎ আগে ন্যায্য বিচার নিশ্চিত হওয়ার পরই প্রশাসনিক শাস্তি দেওয়া হতো।
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাষ্ট্রপতির এই অধ্যাদেশ সংবিধানের ৯৩(১) অনুচ্ছেদের আলোকে জারি হলেও, সংসদ কার্যকর না থাকায় এর বৈধতা প্রশ্নবিদ্ধ। কারণ, সংবিধান অনুযায়ী ৬০ দিনের মধ্যে সংসদীয় অনুমোদন না পেলে কোনো অধ্যাদেশ কার্যকর থাকে না।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ২০০০ সালে নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার বিষয়ক আন্তর্জাতিক চুক্তি (ICCPR) অনুমোদন করেছে, যার ১৪ অনুচ্ছেদে বলা আছে—দোষ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কেউ অপরাধী নয়। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে অভিযোগের ভিত্তিতে বরখাস্তের এই বিধান আন্তর্জাতিক মানবাধিকার চুক্তিরও লঙ্ঘন।
মানবাধিকার সংস্থা ও বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই আইন রাষ্ট্রীয় প্রশাসনে ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ সৃষ্টি করতে পারে। ন্যায়বিচারের বদলে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব যদি প্রাধান্য পায়, তবে এটি বিচারব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও সেনাবাহিনীর নিরপেক্ষতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা ও ন্যায্য বিচারের ভারসাম্য রক্ষা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। অভিযোগ দাখিল মানেই শাস্তি নয়—এই নীতি পুনঃপ্রতিষ্ঠা না করলে আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হবে, আর ন্যায়বিচারের ধারণা কাগজে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।