নিউজ ডেস্ক :: স্বাধীনতার অঙ্গীকার থেকে আজকের অচেনা বাস্তবতা গণতন্ত্রের জায়গা নিয়েছে ভয়, বাকস্বাধীনতার স্থানে নীরবতা, আর রাষ্ট্রের শক্তি এখন নাগরিকের বিপরীতে দাঁড়িয়েছে।
বাংলাদেশ এক সময় ছিল গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও ন্যায়বিচারের আলোকবর্তিকা। কিন্তু সময়ের স্রোতে সেই স্বপ্ন আজ ছায়াচ্ছন্ন। রাষ্ট্রযন্ত্রের ওপর কর্তৃত্ববাদী প্রভাব, ভিন্নমত দমনের প্রবণতা ও সামাজিক ন্যায়ের অবক্ষয় সব মিলিয়ে জাতি এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
*গণতন্ত্রের অবক্ষয়,নিয়ন্ত্রণের রাজনীতি*
অংশগ্রহণমূলক রাজনীতির জায়গায় এখন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে একমুখী শাসন। সিদ্ধান্তগ্রহণে জনগণের মত বা প্রতিনিধিত্বের ভূমিকা প্রায় অনুপস্থিত। রাষ্ট্রযন্ত্র যেন জনগণের সেবক নয়, বরং শাসকের পাহারাদার। বিরোধী মত দমন, সমালোচনাকারীদের ওপর হয়রানি এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি গণতন্ত্রকে করেছে দুর্বল ও ভঙ্গুর।
*বিচার ও মানবাধিকারশক্তির প্রাধান্য, ন্যায়ের অনুপস্থিতি*
আইনের শাসনের পরিবর্তে শক্তির শাসন প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। গুম, গ্রেফতার, মিথ্যা মামলা ও বিচারবহির্ভূত নির্যাতনের অভিযোগ আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং তা রাষ্ট্রীয় বাস্তবতার অংশ হয়ে উঠেছে। আদালত ও প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন বেড়েছে, ফলে সাধারণ মানুষের ন্যায়বিচারের প্রতি আস্থা হারিয়ে যাচ্ছে।
*অর্থনীতি উন্নয়নের মুখোশে বৈষম্যের বিস্তার*
অর্থনীতি আজ কিছু প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে বন্দি। দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, কমিশন বানিজ্য ও বৈদেশিক মুদ্রা পাচার যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। সাধারণ জনগণ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দামে পিষ্ট, আর অভিজাত শ্রেণি ভোগ করছে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা। অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারণ এখন আর জনগণের কল্যাণ নয়, বরং ক্ষমতাসীনদের স্বার্থরক্ষায় নিবদ্ধ।
*সামাজিক অবক্ষয় ও নৈতিক সংকট*
প্রশাসন থেকে শুরু করে শিক্ষাঙ্গন পর্যন্ত দুর্নীতি ও দণ্ডমুক্তির সংস্কৃতি সমাজকে নৈতিকভাবে শূন্য করে দিচ্ছে। রাজনীতিতে আদর্শের পরিবর্তে প্রতিশোধ ও স্বার্থ প্রাধান্য পাচ্ছে। তরুণ সমাজের মধ্যে হতাশা ও অবিশ্বাস ছড়িয়ে পড়েছে। প্রতিবাদের সংস্কৃতি দমে গেছে, আর অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরবতাই যেন এখন নিরাপত্তার একমাত্র উপায়।
*গণমাধ্যমে নীরবতা,সত্যের আলো নিভে যাচ্ছে*
একসময় সংবাদপত্র ও গণমাধ্যম ছিল জাতির বিবেক। আজ তা পরিণত হয়েছে নিয়ন্ত্রিত কণ্ঠে। ভয়, সেন্সর, মামলা ও ডিজিটাল আইনের শৃঙ্খলে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা রুদ্ধ। সত্য প্রকাশের পরিবর্তে আত্মরক্ষাই এখন সংবাদকর্মীদের প্রধান চিন্তা। ফলশ্রুতিতে জনগণ বঞ্চিত হচ্ছে তথ্যের অধিকার থেকে, এবং সমাজ হারাচ্ছে সমালোচনার শক্তি।
বাংলাদেশ একদিন স্বপ্ন দেখেছিল স্বাধীন, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্রের। আজ সেই স্বপ্ন ভয়, দমন ও অনিশ্চয়তার আবরণে ঢাকা। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের একমাত্র পথ—সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষের ঐক্য, নৈতিক সাহস ও গণতন্ত্রের পুনরুত্থান।
ইতিহাস প্রমাণ করে, নীরবতা নয় প্রতিবাদই মুক্তির প্রথম পদক্ষেপ।