পারিবারিক দ্বন্দ্বের জেরে সংঘর্ষে আহত যুবকও ‘জুলাই যোদ্ধার’ তালিকায়,

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক ::২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পারিবারিক বিরোধের জেরে আহত হন রাজশাহীর বাঘার যুবক জাহিদ হাসান (২২)। এ নিয়ে গ্রামে সালিশও হয়। অথচ সরকার পতনের আন্দোলনে অংশগ্রহণের দাবি করে ‘জুলাই যোদ্ধা’ হিসেবে গেজেটভুক্ত হয়েছেন তিনি। এমন ঘটনায় এলাকায় ব্যাপক তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে। আলোচনায় আসা জাহিদ উপজেলার চন্ডিপুর গ্রামের রবিউল ইসলামের ছেলে। স্থানীয়রা জানান, ঢাকায় একটি কোম্পানিতে চাকরি করতেন জাহিদ। ২০২৪ সালের বছরের ১ আগস্ট চাকরি ছেড়ে তিনি গ্রামে ফেরেন। তখন দেশে সরকার পতনের একদফা আন্দোলন চলছিল। গ্রামে ফেরার পর জাহিদ সেই আন্দোলনকে পুঁজি করে পূর্বের পারিবারিক শত্রু মুস্তাক আহমেদ নামের এক স্কুলে শিক্ষককে হুমকি দেন। পরিবারের সঙ্গে মুস্তাকের পরিবারের দীর্ঘদিনের জমি-জমা সংক্রান্ত দ্বন্দ্ব চলছিল। পরে আওয়ামী সরকার পতনের দিন (৫ আগস্ট) সেই স্কুল শিক্ষকের পরিবারের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান জাহিদ। এতে প্রতিপক্ষের পাল্টা হামলায় আহত হন জাহিদ। পরে তাকে স্থানীয়রা উদ্ধার করে প্রথমে বাঘা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, এরপর উন্নত চিকিৎসার জন্য রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে নিয়ে যান।

সংঘর্ষের পর জাহিদের বাবা রবিউল ইসলাম এ ঘটনায় পূর্ব শত্রুতার জের উল্লেখ করে বাঘা থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। যেখানে ৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। পরবর্তীতে এই ঘটনার রেশ ধরে জাহিদ পক্ষের লোকজন প্রতিপক্ষের ওপর হামলা চালায়। এমন পরিস্থিতিতে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ফিরোজ আহমেদ রঞ্জুর সমঝোতায় ৬ লাখ টাকার বিনিময়ে দু’পক্ষের মধ্যে বিষয়টি মীমাংসা হয়।

অথচ সেই চিকিৎসার কাগজপত্র উপস্থাপন করে জাহিদ নিজেকে সরকার পতনের আন্দোলনে আহত হিসেবে ‘জুলাই যোদ্ধার’ তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্ত করেন এবং গেজেট প্রাপ্ত হন। তার গেজেট নম্বর ৮৩৪। মেডিকেল কেস নাম্বার ৫৯৯০।

মামলার বাদী ও জাহিদের বাবা রবিউল ইসলাম বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, জাহিদকে স্থানীয় কিছু আওয়ামী লীগ সমর্থক লোকজন মেরেছিল। তবে আন্দোলনে সে অংশ নিয়েছিল কি-না তা আমি জানি না। এ ব্যাপারে তার সঙ্গে কথা বলেন।

কিভাবে জুলাই যোদ্ধার তালিকায় তার নাম অন্তর্ভুক্ত হলো জানতে চেয়ে যোগাযোগ করা হলে উত্তেজিত হয়ে পড়েন জাহিদ। এ সময় তিনি আন্দোলনে অংশ নিয়ে আহতের দাবি করলেও এর স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ দিতে পারেনি।

এদিকে জাহিদের হামলার ঘটনা নিয়ে বিবাদী পক্ষ নয়নের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, জাহিদের পরিবারের সঙ্গে জমি নিয়ে আমাদের দীর্ঘদিনের শত্রুতা রয়েছে। ৬ আগস্টে জাহিদ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমাদের মারতে এসেছিল। কিন্তু উল্টো সে আহত হয়ে ফিরে যায়। এ ঘটনায় তাদের বাপ-চাচাদের উপর মামলা করেছে জাহিদের পরিবার। পরে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ফিরোজ আহম্মেদ রঞ্জুর মাধ্যমে বিষয়টি রফাদফা হয়।

ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ও ইউপি চেয়ারম্যান ফিরোজ আহাম্মেদ রঞ্জু বলেন, জায়গা জমি নিয়ে দ্বন্দ্বের জেরে স্থানীয় একটি পক্ষ জাহিদের গলায় হাঁসুয়া (ধারালো অস্ত্র) দিয়ে কোপ দিয়েছিল। আল্লাহপাক তাকে বাঁচিয়েছেন। আমিসহ প্রায় শতাধিক লোকজন বসে বিষয়টি মীমাংসা করেছি। তারা ইতোমধ্যে মামলাও তুলে নিয়েছে। জাহিদ কিভাবে জুলাই যোদ্ধার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হলো সেটা আমার জানা নেই।

চন্ডিপুর গ্রামের শিক্ষক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, আমরা সবাই জানি ৫ আগস্ট দুপুরের পর থেকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা এলাকায় ছিল না। তাই ওই দিন রাতে আওয়ামী সমর্থকরা কাউকে মারতে পারে এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়। প্রতারণার মাধ্যমে কেউ আন্দোলনকারীর স্বীকৃতি পেলে প্রকৃত যোদ্ধাদের প্রতি বড় অবিচার হবে।

রহিম নামের একজন কৃষক বলেন, যারা সত্যিকারের আন্দোলন করেছে, তারা এখনও গেজেট পায়নি। অথচ কিছু মানুষ মিথ্যা কাগজপত্র দিয়ে গেজেট পাচ্ছে। এটা শুধু দুর্নীতি নয়, আন্দোলনকারীদের সঙ্গে প্রতারণাও বটে।

স্থানীয় এক পল্লী চিকিৎসক সাইদুর রহমান বলেন, জুলাই আন্দোলন একটি ঐতিহাসিক অধ্যায়। সেখানে অংশগ্রহণ না করেও কেউ যদি ভুয়া প্রমাণ দেখিয়ে গেজেট পান, তবে আন্দোলনের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হবে। প্রশাসনকে অবশ্যই বিষয়টি তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে- এটা আমাদের প্রত্যাশা।

বাঘা উপজেলা নির্বাহী অফিসার শাম্মী আক্তার জানান, আমি একাধিক সূত্র থেকে এ খবরটা শোনার পর, ইউপি চেয়ারম্যান ফিরোজ আহাম্মেদ রঞ্জুকে ফোন করেছিলাম। ওই সময় তিনি আমাকে জানান, এটা জমি সংক্রান্ত সংঘর্ষের ঘটনা। সালিসে মীমাংসাও হয়েছে। তবে জাহিদ জুলাই সনদ কিভাবে পেল সেটা আমার জানা নেই।