পূজার আগেই ১৩ জেলায় প্রতিমা ভাঙচুর ও হামলা, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিধ্বনি নীরব

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৬ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক :: পূজা শুরু হবার আগেই দেশের ধর্মীয় সহাবস্থানের এই কষ্টদায়ক পরীক্ষা কুষ্টিয়া, চট্টগ্রাম, কুড়িগ্রাম, সাতক্ষীরা, ঝিনাইদহ, নেত্রকোণা, গাইবান্ধা, পঞ্চগড়, জামালপুর, নাটোর, গাজীপুর, মানিকগঞ্জ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে একযোগে প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে হামলার খবর আমাদের জাতিগত আত্মচেতনাকে ঝাঁজরা করে দিয়েছে। এ ঘটনা কোনো হৃদরোগী দুর্ঘটনা নয়; এটি সুদূরপরিকল্পিত বিভাজনের চক্রান্তের পুনরাবৃত্তি এবং সেই চক্রই দেড় দশক ধরে একের পর এক অহরহ আঘাত করে যাচ্ছিল বলে কথা বলেছেন সংশ্লিষ্ট নেতৃবৃন্দ।

গত এক বছরে ভয়ের ভেতর দিয়েই পূজা উদযাপন করছে হিন্দু সম্প্রদায়। জঙ্গি আতঙ্ক, গুজব, প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে হামলার কারণে সংখ্যালঘুরা আজ নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছে। ধর্মীয় উৎসব আনন্দের হওয়ার কথা থাকলেও তা পরিণত হচ্ছে ভয়ের উৎসবে। এই ভয় শুধু একটি সম্প্রদায়ের নয়, এটি গোটা জাতির অস্তিত্ব ও মূল্যবোধের ওপর আঘাত।

প্রতিটি প্রতিমা ভাঙচুর, প্রতিটি মন্দিরে অশান্তি—এসব কেবল ভাঙা মাটির কথা নয়; এগুলো আমাদের সামাজিক বন্ধন, মুক্তিযুদ্ধের সার্বভৌম চেতনাপন্ন ঐক্যের ওপর আঘাত। ধর্মীয় উৎসবকে ভীতির উৎসে পরিণত করা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরিকল্পিত গুজব ছড়িয়ে জনমানসে বিভেদ সৃষ্টি করা এসব কার্যক্রম কেবল ক্ষুদ্র অশুভ শক্তির চাল নয় এগুলো দেশ ও সমাজকে ধ্বংসের পথে ঠেলে দেয়।

রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নীরবতা বা অনিশ্চিত প্রতিক্রিয়া এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। শুধু ঘটনার পর সমালোচনামূলক বিবৃতি বা প্রাতিষ্ঠানিক নোটিশ যথেষ্ট নয় দ্রুত ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ দরকার। হামলাকারীদের দ্রুত শনাক্ত করে পক্ষপাতমূলকভাবে নয়, সুষ্ঠু তদন্ত শেষে আইনি ব্যবস্থা নিতে হবে গ্রাম-শহরের মন্দির ও উপাসনাস্থলগুলোর নিরাপত্তা শক্তিশালী করতে হবে; সোশ্যাল মিডিয়ায় রূঢ় ভুয়া বিবৃতি ও উদ্দেশ্যমূলক গুজব ছড়ানো রোধে ডিজিটাল নিরীক্ষা ও আইনী তদারকি বাড়াতে হবে।

কিন্তু সরকার কিংবা পুলিশিভিত্তিক প্রতিকারই একমাত্র পথ নয় সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলাও সমান জরুরি। ধর্মীয় নেতারা, শিক্ষাবিদরা, মিডিয়া ও নাগরিক সমাজ এসব প্রতিষ্ঠানকে মিলে অসাম্প্রদায়িক চেতনা দূরদর্শীভাবে প্রশিক্ষিত করতে হবে। স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে গণমাধ্যমে সার্বিক সচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ধর্মীয় সহনশীলতা ও সহমর্মিতাকে পুনরুজ্জীবিত করতে হবে।

দেশের ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ বলেছে,বাংলাদেশে কোনো ধর্মান্ধতা স্থায়ী হতে পারে না। তাই আজকের এই আঘাতকে আমরা কেবল হিন্দু সম্প্রদায়ের বিষয়ে লোপাট মনে করতে পারি না; এটি আমাদের জাতীয় কর্তব্য যে, অবিলম্বে প্রতিকার এবং পুনরুদ্ধারমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।

উৎসব যেন ভয় না-বিজয়ের মঞ্চ হয়ে দাঁড়ায় বরং তা প্রতিফলিত করুক আমাদের অসাম্প্রদায়িকতার শক্তি। সরকার, সমাজ ও প্রতিটি নাগরিক মিলে যত শিগগির সম্ভব সেই কাজটিই করুন। নীরব প্রতিধ্বনি নয়, কর্মনিষ্ঠ প্রতিরোধই এখন সময়ের দাবি।