দিনপত্র ডেস্ক :: ফরিদপুর-১ আসনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি প্রার্থী খন্দকার নাসিরুল ইসলামের জমাকৃত মনোনয়নপত্র ও হলফনামা ঘিরে গুরুতর জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি হলফনামায় অসম্পূর্ণ, ভুল ও মিথ্যা তথ্য প্রদান করেছেন এবং নিজের নামে আয়কর রিটার্ন, টিআইএন নম্বর ও সম্পদ-দায় সংক্রান্ত বৈধ নথি দাখিল করেননি। বিষয়টি লিখিতভাবে জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তাকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত কোনো দৃশ্যমান কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, খন্দকার নাসিরুল ইসলাম মনোনয়নপত্রের সঙ্গে যে আয়কর নথি সংযুক্ত করেছেন, সেটি তার নিজের নামে নয়। বরং ‘খন্দকার নাসিউল ইসলাম’ নামে অন্য এক ব্যক্তির আয়কর নথি ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই নথিতে ব্যবহৃত টিআইএন নম্বর ২২১০৫৩৮৭৯৯৪১। একজন সংসদ প্রার্থীর নিজের নামে আয়কর রিটার্ন জমা না দিয়ে অন্য নামের নথি দাখিল করা নির্বাচন আইনের গুরুতর লঙ্ঘন এবং সরাসরি জালিয়াতির অভিযোগের জন্ম দেয়।
ভুল নামে জমা দেওয়া ওই আয়কর নথি অনুযায়ী, ‘খন্দকার নাসিউল ইসলাম’-এর মোট সম্পদের পরিমাণ ৪৯ লাখ ৪৪ হাজার ২৯৫ টাকা। অথচ খন্দকার নাসিরুল ইসলাম তার হলফনামায় নিজের সম্পদ দেখিয়েছেন এক কোটি ৮৫ লাখ ৩৮ হাজার ৫০০ টাকা। এই অতিরিক্ত সম্পদের উৎস কোথা থেকে এসেছে—তার পক্ষে কোনো বৈধ আয়কর রিটার্ন, সম্পদ বিবরণী বা সমর্থনযোগ্য নথি জমা দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। অনুসন্ধান সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই ব্যবধান সাধারণ হিসাবগত ভুল নয়, বরং পরিকল্পিত তথ্য গোপনের ইঙ্গিত বহন করে।
সম্পদের পাশাপাশি দায় বা ঋণের তথ্যেও চরম অসংগতি দেখা গেছে। হলফনামায় খন্দকার নাসিরুল ইসলাম তার দায় দেখিয়েছেন ১৬ কোটি ৯৭ লাখ ১৯ হাজার ২৪১ টাকা। অথচ যে আয়কর নথি অন্য নাম ব্যবহার করে জমা দেওয়া হয়েছে, সেখানে ব্যাংক ঋণ দেখানো হয়েছে মাত্র ৫ লাখ টাকা। সম্পদ ও দায়—উভয় ক্ষেত্রেই এমন বিপরীত তথ্যের কোনো গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা এখনো পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে আয়কর বিবরণীতে গাছ বিক্রি বাবদ ১৭ লাখ ২০ হাজার ৩০৫ টাকা আয়ের উল্লেখ থাকলেও খন্দকার নাসিরুল ইসলামের হলফনামায় এই আয় বা অন্য কোনো আয়ের উৎসের বিস্তারিত হিসাব নেই। নির্বাচন আইনে প্রার্থীর সব আয়ের উৎস স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা বাধ্যতামূলক হলেও এই ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি বলেই অভিযোগ উঠেছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, খন্দকার নাসিরুল ইসলাম ঢাকা ব্যাংক ফরিদপুর শাখার একজন ঋণখেলাপি। তবে হলফনামায় এই তথ্য সঠিকভাবে প্রতিফলিত হয়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি। নির্বাচন আইন অনুযায়ী, ঋণখেলাপি সংক্রান্ত তথ্য গোপন করা শুধু মনোনয়ন বাতিলের কারণ নয়, বরং এটি ফৌজদারি অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
নির্বাচন আইন অনুসারে, হলফনামায় মিথ্যা তথ্য প্রদান বা নিজের নামে আয়কর রিটার্ন ও সম্পদ-দায় বিবরণী জমা না দিলে প্রার্থিতা বাতিলের পাশাপাশি ফৌজদারি মামলা দায়েরের সুযোগ রয়েছে। ফরিদপুর-১ আসনের একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থী ইতোমধ্যে এসব অভিযোগ জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে দাখিল করেছেন এবং আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ফরিদপুর জেলার রিটার্নিং কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসক মো. কামরুল হাসান মোল্লা জানিয়েছেন, আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে এত গুরুতর অভিযোগের পরও এখনো কোনো তদন্ত কমিটি গঠন, কারণ দর্শানোর নোটিশ বা প্রার্থিতা স্থগিতের উদ্যোগ না থাকায় নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আরও তীব্র হচ্ছে।
হলফনামায় জালিয়াতির অভিযোগের বিষয়ে খন্দকার নাসিরুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কোনো প্রতিক্রিয়া জানাননি। একজন জাতীয় সংসদ প্রার্থীর এমন নীরবতা অভিযোগের গুরুত্ব ও বিশ্বাসযোগ্যতাকে আরও জোরালো করেছে।
সব মিলিয়ে ফরিদপুর-১ আসনের এই ঘটনা কেবল একজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে অভিযোগ নয়এটি নির্বাচন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইন প্রয়োগের সদিচ্ছা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, নির্বাচন কমিশন সত্যিই আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করবে, নাকি এই গুরুতর অভিযোগও সময়ের আড়ালে চাপা পড়ে যাবে।