বাংলাদেশের মানুষের বেঁচে থাকার জন্য চাল–ডাল–বিদ্যুৎ আসে যেখান থেকে, সেই ভারতের বিরোধিতা কেন মানুষ জানতে চায়

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক :: বাংলাদেশের রাজনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে ভারতবিরোধী বক্তব্যকে পরিকল্পিতভাবে ‘জাতীয়তাবাদ’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা। এই প্রবণতা কেবল রাজনৈতিক মতভিন্নতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই বরং তা রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, ইতিহাস ও বাস্তবতার সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছে। এই ধারার সামনের সারিতে যাদের নাম ঘুরে ফিরে আসছে, তাদের মধ্যে এনসিপির নেতা হাসানাত এবং ইউনুস সরকারের উপদেষ্টা মাষ্টারমাইন্ড মাহফুজ বিশেষভাবে আলোচিত।

২০২৪ সালের সরকারবিরোধী আন্দোলনকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে সহিংসতা, পুলিশের ওপর হামলা, প্রাণহানি ও রাষ্ট্রীয় স্থাপনায় অগ্নিসংযোগের যে ঘটনাপ্রবাহ দেখা গেছে, তা আজও জনমনে গভীর প্রশ্ন তৈরি করে রেখেছে। এসব ঘটনার দায় নির্ধারণ এখনো বিচারিক প্রক্রিয়ায় নিষ্পত্তি হয়নি ঠিকই, কিন্তু রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও নাগরিক সমাজের একটি বড় অংশ মনে করে এই আন্দোলনের কৌশলগত পরিকল্পনা, উসকানিমূলক ভাষা ও সংঘাতমুখী রাজনীতির পেছনে কিছু নির্দিষ্ট ব্যক্তির প্রভাব ছিল, যারা পরবর্তিতে দায় মুক্তি পেয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে হাসানাত ,মাহফুজ সারজিসদের বর্তমান বক্তব্য ও অবস্থান নতুন করে জনস্বার্থের বিচারে পর্যালোচনার দাবি রাখে।

বিশেষ করে উদ্বেগ বাড়ে তখনই, যখন হাসানাত ও মাহফুজদের বক্তব্যে পাকিস্তানের ঐতিহাসিক বয়ানের সঙ্গে মিল খুঁজে পাওয়া যায়। ভারতকে একমাত্র ‘শত্রু’ হিসেবে চিহ্নিত করার এই প্রবণতা বাংলাদেশের বহুমাত্রিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে। এটি আর নিছক মতপ্রকাশ থাকে না বরং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের সঙ্গে সাংঘর্ষিক একটি রাজনৈতিক অবস্থানে রূপ নেয়।

বাস্তবতা নির্মম ও স্পষ্ট। বাংলাদেশের মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাত্রা আজ খাদ্য, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত। চাল, ডাল, ভোজ্যতেল এবং বিদ্যুতের একটি বড় অংশ আসে ভারত থেকে। সংকটের মুহূর্তে এই সরবরাহই বাজার স্থিতিশীল রাখে, শিল্প উৎপাদন সচল রাখে এবং সাধারণ মানুষের জীবনধারাকে টিকিয়ে রাখে। এই বাস্তবতা জেনেও যদি কেউ ভারতবিরোধী উত্তেজনা উসকে দেয়, তবে প্রশ্ন ওঠে এই রাজনীতি কার স্বার্থ রক্ষা করছে?

এর চেয়েও গভীর সত্য রয়েছে ইতিহাসে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত এক কোটি বাংলাদেশি শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল যা উপমহাদেশের ইতিহাসে বিরল মানবিক দৃষ্টান্ত। ভারতীয় মিত্রবাহিনীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর পরাজয় নিশ্চিত করা সম্ভব হতো না—এটি কোনো রাজনৈতিক মত নয়, বরং ইতিহাসের স্বীকৃত সত্য। এই সত্য অস্বীকার করা মানে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করা।

তবু প্রশ্ন থেকেই যায় কেন কিছু নব্য তথাকথিত রাজনৈতিক নেতা বারবার ভারতবিরোধী আবেগ উসকে দিতে আগ্রহী? কেন তারা পাকিস্তানের পরাজিত, অসমাপ্ত বয়ানকে নতুন মোড়কে হাজির করতে চায়? এটি কি আদর্শিক বিভ্রান্তি, নাকি সচেতনভাবে সংঘাতনির্ভর রাজনীতির পথ বেছে নেওয়া?

বাংলাদেশের স্বাধীনতা কোনো আবেগী স্লোগানে অর্জিত হয়নি। এটি এসেছে রক্ত, ত্যাগ, আন্তর্জাতিক সমর্থন ও কৌশলগত মিত্রতার মাধ্যমে। সেই ইতিহাসকে অস্বীকার করে, বাস্তবতাকে উপেক্ষা করে যারা রাজনীতি করতে চায়, তারা কেবল ভারতের বিরোধিতা করছে না তারা বাংলাদেশের রাষ্ট্রসত্তা ও ভবিষ্যৎকেই ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।

আজ তাই মানুষ জানতে চায়—যেখান থেকে চাল–ডাল–বিদ্যুৎ আসে, যে দেশ একসময় শরণার্থীকে আশ্রয় দিয়েছিল, মিত্রবাহিনী হয়ে বিজয় নিশ্চিত করেছিল সেই ভারতের বিরুদ্ধে এই অন্ধ বিদ্বেষ কেন? এই প্রশ্নের সৎ উত্তর না দিলে, ভারতবিদ্বেষ দিয়ে ক্ষমতার সিঁড়ি বানানোর রাজনীতি শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের জন্যই বিপজ্জনক প্রমাণিত হবে।