বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ‘নিরলস’ সহিংসতা: ৭ মাসে নিহত ১১৬ জন, ডিসেম্বরে ২২

লেখক: সুমিত বিশ্বাস
প্রকাশ: ২ মাস আগে

ঢাকা | বিশেষ প্রতিবেদন
বাংলাদেশে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর গত সাত মাসে হিন্দুসহ বিভিন্ন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সহিংসতা ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস কংগ্রেস ফর বাংলাদেশ মাইনরিটিজ (HRCBM)–এর এক সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৬ জুন থেকে ২০২৬ সালের ৫ জানুয়ারি পর্যন্ত সময়কালে দেশজুড়ে অন্তত ১১৬ জন সংখ্যালঘু সদস্য নিহত হয়েছেন। শুধু ডিসেম্বর মাসেই প্রাণ হারিয়েছেন ২২ জন। সংগঠনটির ভাষ্য, এসব ঘটনা কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়, বরং এটি একটি গভীর ও দেশব্যাপী মানবাধিকার সংকটের ইঙ্গিত বহন করে।
৪৫ জেলায় সহিংসতা: দেশজুড়ে আতঙ্ক
এইচআরসিবিএম জানায়, সংখ্যালঘুদের ওপর সহিংসতা দেশের কোনো একটি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ ছিল না। আটটি প্রশাসনিক বিভাগের অন্তত ৪৫টি জেলায় হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। সংস্থাটি একে সাম্প্রতিক ইতিহাসে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার সবচেয়ে গুরুতর পর্যায় হিসেবে উল্লেখ করেছে।
মৃত্যুর ধরন: ভয়াবহ পরিসংখ্যান
প্রতিবেদনে নিহতদের মৃত্যুর কারণ বিশ্লেষণ করে যে তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, তা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে—
পরিকল্পিত বা টার্গেটেড হত্যা: ৪৮.৩%
সন্দেহজনক মৃত্যু (সহিংস পরিস্থিতিতে): ১২.৯%
গণপিটুনি (মব লিঞ্চিং): ১০.৩%
রাষ্ট্রীয় বাহিনীর গুলিতে মৃত্যু: ৮.৬%
পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু: ৬.৯%
‘কাঠামোগত সহিংসতা’র অভিযোগ
এইচআরসিবিএম দাবি করেছে, এসব হত্যাকাণ্ডকে সাধারণ অপরাধ হিসেবে দেখলে প্রকৃত চিত্র আড়াল হয়ে যাবে। তাদের মতে, এটি একটি কাঠামোগত সহিংসতার ধারাবাহিক রূপ। প্রতিবেদনে ১৯৪৬ সাল থেকে শুরু করে ১৯৫০, ১৯৬৪, ১৯৭১, ২০০১ এবং সর্বশেষ ২০২৪–২৫ সালের ঘটনাপ্রবাহের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির মিল তুলে ধরা হয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, ১৯৪৬ সালে যেখানে দেশে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর হার ছিল প্রায় ৩০ শতাংশ, সেখানে ২০২০ সালে তা নেমে এসেছে ৯ শতাংশের নিচে। এই প্রবণতাকে একটি জনগোষ্ঠীকে ধীরে ধীরে নিশ্চিহ্ন করার দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিসেম্বরে দীপু চন্দ্র দাস হত্যাকাণ্ড
প্রতিবেদনে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে দীপু চন্দ্র দাসের হত্যাকাণ্ডকে বিশেষভাবে উদ্বেগজনক ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। ধর্ম অবমাননার ‘অযাচাইকৃত’ অভিযোগে জনতার হাতে তিনি নিহত হন। অভিযোগ রয়েছে, সময়মতো পুলিশি হস্তক্ষেপ না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এই ঘটনা সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে নতুন করে নিরাপত্তাহীনতা ও অস্তিত্বের সংকট তৈরি করেছে।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি
এইচআরসিবিএম বলছে, রাজনৈতিক প্রভাব, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা ও দুর্বল তদন্ত প্রক্রিয়ার কারণে অপরাধীরা কার্যত দায়মুক্তি পাচ্ছে। বহু ক্ষেত্রে মামলা গ্রহণে গড়িমসি এবং সুষ্ঠু তদন্তের অভাব স্পষ্ট।
মানবিক বিপর্যয়
প্রতিবেদনটি জানায়, নিহতদের বড় একটি অংশ ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। তাদের মৃত্যুতে অসংখ্য পরিবার—বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক সদস্যরা—চরম অর্থনৈতিক ও সামাজিক অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছেন, যা একটি চলমান মানবিক সংকটে রূপ নিচ্ছে।