বাংলাদেশ মৌলবাদ জঙ্গী, বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নতুন নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত পাচ্ছে

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক :: দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত মানচিত্রে বাংলাদেশ এক সময় পরিচিত ছিল শান্তি, মানবিকতা ও গণতান্ত্রিক অগ্রগতির দেশ হিসেবে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি পরিণত হচ্ছে সশস্ত্র গোষ্ঠী, জঙ্গী ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিরাপদ আশ্রয়ে। সীমান্ত থেকে রাজধানী পর্যন্ত বিস্তৃত এই নেটওয়ার্ক এখন রাষ্ট্রের জন্য ভয়ংকর হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর একাধিক রিপোর্ট বলছে, বাংলাদেশের সীমান্ত অঞ্চল— বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রাম, সুনামগঞ্জ, ময়মনসিংহ ও কক্সবাজার— এখন অস্ত্র চোরাচালানের প্রধান রুটে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তান, তুরস্ক, চীন, থাইল্যান্ড ও ভারতের অস্ত্র চক্রগুলো এখানে স্থাপন করেছে তাদের “ট্রানজিট হাব”। ভারতের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন উলফা (ULFA), পাকিস্তানি জঙ্গী নেটওয়ার্ক ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক অস্ত্র সিন্ডিকেট ভাগে ভাগে বাংলাদেশের সীমান্তে অবস্থান শক্ত করছে।

ছোট আগ্নেয়াস্ত্র থেকে শুরু করে চাইনিজ রাইফেল, গ্রেনেড, কার্তুজ— সবই পাচার হচ্ছে সীমান্ত পেরিয়ে। এসব অস্ত্রের একটি বড় অংশ পরে রাজনীতিক, দখলবাজ, চাঁদাবাজ ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে চলে যাচ্ছে।
ফলে সীমান্ত এখন কেবল কূটনৈতিক সীমারেখা নয়— এটি হয়ে উঠছে অপরাধের রণক্ষেত্র।

মিয়ানমার সীমান্ত: আগুনের আঁচে বাংলাদেশ

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পার্বত্য এলাকাগুলোতে বর্তমানে এক নীরব যুদ্ধ চলছে। মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদীরা বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে জান্তা বাহিনীর ওপর হামলা চালাচ্ছে— এই তথ্য এখন প্রকাশ্য।
রাঙামাটি, বান্দরবান, থনচি, রুমা— এসব অঞ্চলে রাতের অন্ধকারে গুলির শব্দ এখন প্রায় নিয়মিত। পাহাড়ি গ্রামগুলোতে আতঙ্কের ছায়া নেমে এসেছে, স্থানীয় জনগণ বাধ্য হচ্ছে এলাকা ছেড়ে চলে যেতে।

“নতুন রাষ্ট্র” গঠনের নামে কিছু সশস্ত্র গোষ্ঠী স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর হামলা চালাচ্ছে, অপহরণ করছে ব্যবসায়ী ও উন্নয়নকর্মীদের। এক সময় শান্তিপ্রিয় পার্বত্য জনপদ আজ জঙ্গীবাদের পরীক্ষাগার হয়ে উঠেছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান অবৈধ ইউনুস সরকারের প্রশাসনিক অদক্ষতা ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে ভয়াবহভাবে।
এক সময় যে বাংলাদেশ জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে প্রশংসিত হয়েছিল, সেই দেশেই আজ জঙ্গীরা পুনরায় সংগঠিত হচ্ছে।

গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি–জামাত–শিবির এবং এনপিপির একাংশের নেতা–কর্মীরা বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র মজুদ করছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় “ঘরোয়া ক্যাম্প” স্থাপন করে প্রশিক্ষণ ও কৌশলগত প্রস্তুতি নিচ্ছে এই গোষ্ঠীগুলো।
তাদের লক্ষ্য— সরকার পতন নয়, রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে ভেতর থেকে ভেঙে দেওয়া।

সেনাবাহিনী ও গোয়েন্দা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একটি অংশ আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন— পাকিস্তানের পুরনো মডেল অনুসরণ করে বাংলাদেশের কিছু প্রভাবশালী সামরিক গোষ্ঠী হয়তো জঙ্গীদের প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র সরবরাহে জড়িত।
এই অভিযোগের পূর্ণ সত্যতা না মিললেও সীমান্তের সাম্প্রতিক সহিংসতা, অস্ত্র উদ্ধার ও নিখোঁজ প্রশিক্ষিত সদস্যদের উপস্থিতি ইঙ্গিত দিচ্ছে গভীর ষড়যন্ত্রের দিকে।

যদি নিরাপত্তা বাহিনী রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিভক্ত হয় বা কোনো পক্ষের হয়ে কাজ করে, তবে সেটিই হবে রাষ্ট্রের জন্য সবচেয়ে ভয়াবহ সংকেত।

২০০৯ থেকে ২০২৩— এই সময়কালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছিল।
শেখ হাসিনার আমলে বাংলাদেশে জঙ্গী দমন ছিল দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে সফল মডেল হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত।
হলি আর্টিজান হামলার পর গোয়েন্দা বাহিনী যেভাবে পরিকল্পিত অভিযানে দেশজুড়ে জঙ্গী নেটওয়ার্ক ভেঙে দিয়েছিল, তা জাতিসংঘ ও যুক্তরাষ্ট্র পর্যন্ত প্রশংসা করেছিল।
সীমান্তের বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীগুলোকেও চাপে রাখা হয়েছিল, ফলে পার্বত্য এলাকায় এক দশকেরও বেশি সময় শান্তি ফিরে এসেছিল।

কিন্তু ইউনুস সরকার ক্ষমতায় আসার পর সেই সাফল্য আজ ধ্বংসের মুখে।

নতুন প্রশাসন ক্ষমতায় এসে যেভাবে জঙ্গীদের জেল থেকে মুক্তি দিয়েছে, তা দেশপ্রেমিক জনগণের মনে গভীর ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
যেসব পুলিশ, র‍্যাব ও সেনা কর্মকর্তা জঙ্গী দমন অভিযানে বীরত্ব দেখিয়েছিলেন— তাদের বিরুদ্ধে এখন মিথ্যা মামলা, ওয়ারেন্ট, এবং পদচ্যুতি চলছে।
নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা বলছেন, “এই সরকার জঙ্গী দমনকে অপরাধ হিসেবে দেখছে, যেন জঙ্গীদের মনোবল বাড়াতে চায়।”

ফলে যারা দেশের জন্য জীবন বাজি রেখে সন্ত্রাস দমন করেছিল, তারা আজ নিজ দেশে পরাধীন। আর যারা বন্দুক হাতে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করেছিল, তারা মুক্ত বাতাসে ঘুরছে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায়।

বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে রাষ্ট্রীয় নীরবতা।
যখন প্রশাসন, রাজনীতি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সমন্বয় ভেঙে পড়ে, তখন সশস্ত্র চক্রগুলো দ্রুত মাথা তোলে।
আজ রাজধানীর পাশে যদি অস্ত্রের গুদাম, সীমান্তে যদি যুদ্ধ, আর প্রশাসনে যদি ভয়— তাহলে সেই রাষ্ট্রের স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

সন্ত্রাস শুধু একটি গোষ্ঠীর কাজ নয়; এটি এক ধরনের “রাজনৈতিক অর্থনীতি”, যা দুর্বল প্রশাসন ও অনিশ্চিত ক্ষমতার ফাঁকে জন্ম নেয়।
বাংলাদেশ এখন সেই ফাঁদে প্রবেশ করছে।

বাংলাদেশকে আবার শান্তির পথে ফিরিয়ে আনতে হলে প্রয়োজন দৃঢ় রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি, কার্যকর গোয়েন্দা সমন্বয় ও জঙ্গী দমনে পুনরায় কঠোর নীতি।
রাষ্ট্রকে প্রমাণ করতে হবে— বাংলাদেশের মাটি কোনো সন্ত্রাসী বা বিদেশি স্বার্থগোষ্ঠীর আশ্রয়স্থল নয়।

একইসঙ্গে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে হবে, কারণ অস্ত্রের রাজনীতি তখনই টিকে থাকে যখন মানুষ ভয় পায়।
রাষ্ট্র যদি সাহসী হয়, জনগণও নিরাপদ থাকবে।

বাংলাদেশ আজ এক সংকটময় ক্রান্তিকালে দাঁড়িয়ে। একদিকে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা, অন্যদিকে সীমান্তে অস্ত্র ও বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উত্থান— এই দুইয়ের সংঘর্ষে রাষ্ট্রের ভিত্তি নড়ে যাচ্ছে।
শেখ হাসিনার শাসনামলে যে দেশটি জঙ্গী দমনে আন্তর্জাতিক প্রশংসা পেয়েছিল, আজ সেই দেশেই আবার সন্ত্রাস মাথাচাড়া দিচ্ছে।

রাষ্ট্র যদি এখনই জেগে না ওঠে, তবে ইতিহাস হয়তো বলবে বাংলাদেশ নিজের অর্জন নিজেই ধ্বংস করেছে।

এখন প্রয়োজন একটাই পদক্ষেপ—জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে আবারও জিরো টলারেন্স।
কারণ, রাষ্ট্র যদি ঘুমায়, তবে সীমান্ত থেকে রাজধানী সর্বত্রই শাসন করবে বন্দুকের নল।