বাংলাদেশ সীমান্তে নজরদারি জোরদার করতে পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি সচল করছে ভারত

লেখক: সুমন মাহমুদ,
প্রকাশ: ২ মাস আগে

নয়াদিল্লি | আন্তর্জাতিক ডেস্ক
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক যখন সাম্প্রতিক দশকের মধ্যে সবচেয়ে নাজুক পর্যায়ে, ঠিক সেই সময় সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদারে বড় কৌশলগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর পাঁচটি পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি বা এয়ারস্ট্রিপ পুনরায় সচল করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে নয়াদিল্লি।
টাইমস অব ইন্ডিয়া–র এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরায় অবস্থিত এই পুরনো বিমানঘাঁটিগুলো পুনর্গঠনের প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। মূলত শিলিগুড়ি করিডর বা ‘চিকেনস নেক’কে ঘিরে নিরাপত্তা জোরদার করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে মনে করছেন প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকেরা।
শিলিগুড়ি করিডর হলো মূল ভূখণ্ড ভারতের সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের আটটি রাজ্যের একমাত্র স্থলসংযোগ। করিডরটির প্রস্থ কোনো কোনো স্থানে মাত্র ২০–২৫ কিলোমিটার হওয়ায় এটি ভারতের সবচেয়ে স্পর্শকাতর কৌশলগত অঞ্চলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি নিয়ে উদ্বেগ
ভারতীয় প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই সিদ্ধান্তের পেছনে অন্যতম বড় কারণ হলো বাংলাদেশের লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি পুনর্নির্মাণের উদ্যোগ। সীমান্তের খুব কাছাকাছি অবস্থিত এই ঘাঁটি শিলিগুড়ি করিডরের নিরাপত্তা নিয়ে ভারতীয় সামরিক মহলে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
যদিও ঢাকা আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছে, লালমনিরহাট বিমানঘাঁটি কেবল জাতীয় প্রয়োজনে ব্যবহৃত হবে, তবুও নয়াদিল্লি কোনো ঝুঁকি নিতে রাজি নয় বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সীমান্তে বাড়ছে সামরিক প্রস্তুতি
এই প্রেক্ষাপটে ভারত সীমান্ত এলাকায় সামরিক প্রস্তুতি ঢেলে সাজাচ্ছে। ইতোমধ্যে পশ্চিমবঙ্গ ও বিহারের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ‘লাচিত বরফুকন’ নামে তিনটি নতুন সেনাঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে। পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটি পুনরুজ্জীবনের উদ্যোগকে এই বৃহত্তর প্রতিরক্ষা কৌশলের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
যেসব বিমানঘাঁটি পুনর্গঠন করা হচ্ছে
পরিকল্পনা অনুযায়ী যেসব বিমানঘাঁটি বা এয়ারস্ট্রিপ সংস্কার করা হবে, সেগুলো হলো—
পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার আমবাড়ি ও পাঙ্গা,
দক্ষিণ দিনাজপুরের বালুরঘাট,
মালদহের ঝালঝালিয়া,
এবং আসামের ধুবড়ি।
এর আগে কোচবিহার ও আসামের রূপসী বিমানবন্দর সফলভাবে সচল করা হয়েছে, যা জরুরি সামরিক অপারেশনে ভারতীয় বিমান বাহিনীর সক্ষমতা বাড়িয়েছে।
জরুরি ব্যবহারের উপযোগী করা হবে
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে Airports Authority of India (AAI) এসব বিমানক্ষেত্রের দায়িত্ব রাজ্য সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারি কর্মকর্তা জানান, জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সেনা মোতায়েন, রসদ সরবরাহ কিংবা উদ্ধার অভিযানের জন্য এসব রানওয়ে প্রস্তুত রাখা হবে।
তবে দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত থাকায় অনেক রানওয়ে এখন জঙ্গলে ঢেকে গেছে, কোথাও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত, আবার কোথাও জনবসতি গড়ে উঠেছে। ফলে বড় যুদ্ধবিমান পরিচালনা আপাতত সম্ভব নয়।
ভারতীয় কর্তৃপক্ষের লক্ষ্য হলো, ন্যূনতম সংস্কারের মাধ্যমে এসব ঘাঁটিকে হেলিকপ্টার, পরিবহন বিমান ও ছোট সামরিক বিমানের উপযোগী করে তোলা।
কৌশলগত বার্তা
টাইমস অব ইন্ডিয়ার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, সীমান্তের ওপারে ভূরাজনৈতিক পরিবর্তন, বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর বাড়তি তৎপরতার প্রেক্ষাপটে ভারত তার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের প্রতিরক্ষা অবকাঠামোকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে।
সব মিলিয়ে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি বহন করা এই পরিত্যক্ত বিমানঘাঁটিগুলো পুনরায় সচল করা শুধু অবকাঠামোগত উন্নয়ন নয়, বরং উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পথে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত পদক্ষেপ হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে।