নিউজ ডেস্ক ::
ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি নিযুক্ত করায় সামরিক অফিসাররা অ-খুশি ছিল এবং তারা ওসমানিকে এড়িয়ে চলত। মুজিববাহিনী সৃষ্টি তাদের অবিশ্বাসকে আরও বৃদ্ধি করে। শফিউল্লাহ, জিয়া ও খালেদ মোশাররফ- এই তিনজনের মধ্যে ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল”।
সুশৃঙ্খল নিয়ম এবং চেইন অব কমান্ড মেনে সেনাবাহিনী গড়ে তোলা সম্ভবত অসম্ভব ছিল মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী বাংলাদেশে। বরং মুক্তিযুদ্ধের সময়ের কিছু অসন্তোষ-অস্থিরতার ধারাটাই বহমান থেকেছে এবং ক্রমশই প্রবলতর হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশে। আবার সত্যের খাতিরেই মেনে নিতে হবে যে, একটা প্রবল রাজনৈতিক মুক্তিযুদ্ধের ভের দিয়ে (অথবা যদি বলেন ঐতিহ্য নিয়ে) গড়ে উঠেছিল যে সেনাবাহিনী, তাতে নানা-রঙ-রাজনীতি ঢুকে গিয়েছিল জন্ম-মুহুর্তেই।
প্রসঙ্গতই প্রশ্ন জাগতে পারে, স্বদলীয় অনেক নেতাকর্মীর স্বজনপ্রীতি এবং অনাচার-দুর্নীতির প্রতি কি মুজিবের সমর্থন ছিল কিংবা তিনি কি চোখ বন্ধ করে রাখতেন? শেখ সাদী জানাচ্ছেন, ”বঙ্গবন্ধু দেখলেন দুর্নীতির নৈরাজ্যে সারা দেশে প্রাণদৈন্য। যতদিন না এই সমস্যা দূর হয়, ততদিন উন্নতির চেষ্টা ভিত্তিহীন। ১৯৭৫ সালের ২১ জুলাই বললেন, ’জনগণের সেবার জন্যই আমরা নির্বাচিত হয়েছি আজ আমার কাছে আপনারা তওবা করে যান যে স্বজনপ্রীতি করবেন না। ঘুষখোরদের সাহায্য করবেন না। মাত্র কয়েকটা লোকের জন্য বাংলাদেশের মানুষের দুঃখ দূর করা যায় না। আমি এর প্রতিকার দেখতে চাই। আমার কর্মী যাঁরা আছেন, যাঁরা আমার কথায় বন্দুক ধরে যুদ্ধ করেছিলেন, যাঁরা আমার কথায় সবকিছু ত্যাগ করতে পারতেন, তাঁরা আমার একটা কথা রাখুন। ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করুন’। ষড়যন্ত্রের জালে ঘিরে ফেলে সারা দেশ। আলোও আঁধারের দুই পথ সামনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন ’মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ’ জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কথাটি বিশ্বাস করেছেন বঙ্গবন্ধু”।
১৯৭১’র ২৫ মার্চ দিবাগত রাতে (২৬ মার্চ) বঙ্গবন্ধুকে ঢাকার ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাসা থেকে গ্রেপ্তার করে সংবাদটি বিশ্ববাসীকে জানাতে (১০ এপ্রিল) প্রায় দু’সপ্তাহ বিলম্ব করেছিল ইয়াহিয়া খানের সেনা-আমলা চক্র। অথচ মুজিব-হত্যার ”তিন ঘন্টার মধ্যেই মুজিবের মৃত্যু ও বাংলাদেশের পরিস্থিতির ওপর করাচি ও লাহোরের পত্র-পত্রিকাগুলো বিশেষ বুলেটিন বের করে এবং রেডিও পাকিস্তান সকাল ৮টার খবরে তা প্রচার করে”।
আরো উল্লেখ্য যে, ”১৬ আগষ্ট উর্দু পত্রিকা ’নওয়া-ই-ওয়াক্ত’ দীর্ঘ সম্পাদকীয়তে মোশতাককে পাকিস্তানের সঙ্গে একত্রিত হয়ে দেশের নাম ’পূর্ব পাকিস্তান’ বা ’পূর্ব পাকিস্তান ইসলামিক প্রজাতন্ত্র’ রাখার প্রস্তাব দেয়। ’পাকিস্তান টাইমস’ এই পরিবর্তনের ফলে দ্বি-জাতিত্ত্বের ভিত্তিতে ’মুসলিম বাংলা’ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলে মন্তব্য করে। উর্দু দৈনিক ’জং’ এক সম্পাদকীয়তে (১৮ আগস্ট) মন্তব্য করে, ’বাংলাদেশের মানুষ পাকিস্তান ও পাকিস্তানি আদর্শের প্রতি বিদ্বেষী নয়’। পত্রিকাটিতে মোশতাক সরকারকে মুজিব আমলের পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভুলগুলো শুধরে নিয়ে অনতিবিলম্বে সম্পর্ক স্থাপনেরও পরামর্শ দেওয়া হয়। ১৭ আগস্ট রেডিও পাকিস্তানে প্রচারিত এক খবরে বাংলাদেশের নতুন সরকারের ’ইসলামিক প্রজাতন্ত্র বাংলাদেশ’ নামকরণের প্রশংসা করে”।
ড. আবু মো. দেলোয়ার হোসেন আরো উল্লেখ করেছেন, ”২০ আগস্ট লন্ডনে জামায়াতে ইসলামি প্রভাবিত ’মিল্লাত’ পত্রিকা ১৫ আগস্ট অভ্যুত্থানের পেছনৈ ভুট্টোর হাত রয়েছে বলে মন্তব্য করা হলে পাকিস্তান চিন্তিত হয়ে পড়ে। অবশ্য মুজিব বিরোধীদের আর্থিক সহায়তা প্রদানের সাক্ষ্যও এ ধারণাকে ঘনীভূত করে তোলে”। অপরদিকে ড. দেলোয়ার একথাও উল্লেখ করেছেন যে, ”পাকিস্তানের (অন্যতম অখ্যাত পত্রিকা) ’আল ফাতাহ’র সম্পাদক ওয়াহাব সিদ্দিকী ২২ আগস্ট মুজিব-হত্যায় দুঃখ প্রকাশ করে মন্তব্য করেন, মুজিব দেশের অর্থনৈতিক অবস্থঅর উন্নতি করার যথেষ্ট চেষ্টা চালান। কিন্তু দেশের অবস্থার যখন উন্নতি হচ্ছিল, ঠিক তখনই তিনি নিহত হন। পাকিস্তানে ওয়াহাব সিদ্দিকীর সহমতের লোকের সংখ্যা হাতেগোনা। পাকিস্তানের সরকারের সঙ্গে বিরোধী দলের বিভিন্ন বিষয়ে মতবিরোধ থাকলেও বাংলাদেশের নতুন সরকারের ব্যাপারে তাদের মধ্যে মিলই ছিল বেশি”।
একান্ত স্বাভাবিকভাবেই ”মুজিব হত্যাকাণ্ডে সবচেয়ে বেশি উৎসাহ প্রকাশ করে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে থাকা স্বাধীনতা-বিরোধীরা। তাদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত লন্ডনে মুজিব হত্যাকাণ্ডের পরের দিনই তারা বাংলাদেশের হাই কমিশনার সৈয়দ আব্দুস সুলতানসহ স্বাধীনতাপন্থীদের দূতাবাস থেকে বের করে দেয়। বিক্ষোভকারীরা মুজিবের ছবি টেনে নামায় এবং তা ভেঙে রাস্তায় ফেলে দেয়। রাজাকার গোলাম আযম জেদ্দা থেকে নতুন সরকারকে স্বীকৃতি দানের জন্য মোশতাক ও ভুট্টোকে ধন্যবাদ জানিয়ে একটি পত্র পাঠান। পত্রিকায় বিবৃতি দিয়ে বাঙালি নেতা আহম্মদ আলী, খাজা খয়ের উদ্দিন, হামিদুল হক চোধুরী, কামারুজ্জামান (যুদ্ধাপরাধের দায়ে ফাঁসীর সাজাপ্রাপ্ত), ও নসরুল্লাহ নামে একজন প্রাক্তন এমএনএ, সোহরাওয়ার্দী কন্যা ও ভুট্টোর প্রাক্তন উপদেষ্টা আখতারি সোলায়মান ও ঢাকার নওয়াব খাজা হাসান আসকারি পাকিস্তান সরকারের বাংলাদেশের নীতিকে সমর্থন এবং মোশতাক সরকারের সাফল্য কামনা করেন। মূলত তাদের আগ্রহেই কনফেডারেশনের ইস্যুটি আবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। ৯ সেপ্টেম্বর রাওয়ালপিন্ডি ও ইসলামাবাদে ঐক্যবদ্ধ পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ’পাকিস্তান বাংলাদেশ সংহতি পরিষদ’ নামে একটি সংগঠন আত্মপ্রকাশ করে”।
এবার মনোযোগ দেয়া যাক বঙ্গবন্ধু (এবং মুক্তিযুদ্ধের মূল্যবোধ) হত্যার জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রের প্রেক্ষাপটের দিকে। এখানে সামগ্রিকভাবে বিষয়টির উপলব্ধির তথ্য-ভিত্তি হিসেবে কয়েকটি সুদীর্ঘ নিবন্ধের সংক্ষেপিত অংশ উদ্ধৃত করবো। প্রথমটি ইউরোপিয়ান আওয়ামী লীগের সভাপতি অনিল দাসগুপ্তের ’মুজিব হত্যায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা’। দাসগুপ্ত লিখেছেন : ”১৯৭১ সালে আমেরিকান পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জার বলেছিলেন, দুনিয়ায় তাদের যে ক’জন দুশমন আছে, বাংলাদেশের শেখ মুজিব এদের অন্যতম। অন্য দু’জন ছিলেন ভিয়েৎনামের রাষ্ট্রনায়ক থিউ ও চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দে। প্রতিশোধপরায়ণ কিসিঞ্জার তাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে উৎখাত করার চক্রান্ত করেছিলেন”।
মার্কিন সাংবাদিক লরেন্স লিফসুল্টজের ’বাংলাদেশ : দ্য আনফিনিশড রেভ্যুলেশন’ নামক গ্রন্থটি থেকে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানা যায় : ”ক. আমেরিকান পররাষ্ট্র দপ্তরের অফিসাররা বলেছেন, যে চক্রটি মুজিবকে হত্যা করে, তাদের প্রতিনিধিগণ ১৯৭৪ সালের শরৎকালে ঢাকার মার্কিন দূতাবাসে এসে এ ব্যাপারে সাহায্য চায়। খ. ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের সিআইএ-এর ’স্টেশন চিফ’ ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট অর্থাৎ মুজিব-হত্যার দিন পর্যন্ত চক্রান্তকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছে। গ. মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর মি. লিফসুল্টজকে জানিয়েছে যে, মাহবুব আলম চাষী, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, এ.বি.এস সফদার ছিলেন তখন মার্কিন গুপ্তচর সংস্থা সিআইএ-এর মুখ্য এজেন্ট। ঘ. ঢাকার সিআইএ-এর স্টেশন চিফ ফিলিপ চেরি বলেছেন, ’আমাদের যোগাযোগটা এতো ভাল ছিল যে, অভ্যুত্থানের খবর পেয়ে আমরা খুব শিগগিরই তা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠাতে পেরেছিলাম’। ঙ. চেরি স্বীকার করেন যে, তিনি যখন যুক্তরাষ্ট্রে খবর পাঠান, তখনও অভ্যুত্থান চলছিল। পররাষ্ট্র দপ্তরের এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ’খন্দকার মোশতাক গংদের সঙ্গে এই যোগাযোগ ছিল ১৯৭১ সালে, সেই কলকাতা থেকেই। ১৯৭১ সালে মোশতাক-চাষীদের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যে যোগাযোগ ছিল ১৯৭৫ সালেও তা অক্ষুণ্ন ছিল”।
”ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের জনৈক সিনিয়র অফিসার জানান, প্রস্তাবিত অভ্যুত্থান সম্পর্কে স্থানীয় ষড়যন্ত্রকারীদের সঙ্গে ১৫ আগস্টের (১৯৭৫) চার-পাঁচ মাস আগে থেকেই ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বৈঠক হয়েছে। ঢাকার মার্কিন দূতাবাস তিন দিন আগেই ১৫ আগস্ট (১৯৭৫) ছুটির দিন বলে ঘোষণা করেছিল। এই ছুটি ছিল তালিকা-বহির্ভূত ছুটি। আর এই দিনই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে সপরিবারে হত্যা করা হয়। ঢাকার মার্কিন দূতাবাস জানত ঐদিন তাদের আজ্ঞাবহ সেনাবাহিনীর একদল চক্রান্তকারী অফিসার শেখ মুজিবকে হত্যা করবে”।
”বঙ্গবন্ধু-হত্যায় প্রত্যক্ষভাবে নেতৃত্বদানকারী মেজর ফারুক-রশিদরা যতই দাবি করুক – মুজিব হত্যার পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত তাদের নিজেদের, এটা সম্পূর্ণ মিথ্যে। ফারুক-রশিদরা মূল চক্রান্তকারীদের হাতের হাতিয়ার ছিল। এর বেশি কিছু নয়। এই হত্যাকাণ্ডের কন্ট্রোল রুম ছিল ঢাকার মার্কিন দূতাবাস, তার প্রমাণ হল – মুজিব হত্যার প্রথম ঘোষণা আসে ওয়াশিংটনের ’ভয়েস অব আমেরিকা’ থেকে। অভ্যুত্থানের কাজ সম্পূর্ণ শেষ হওয়ার আগেই দুনিয়াময় ’ভয়েস অব আমেরিকা’ অভ্যুত্থানের খবর ছড়াতে থাকে। ফিলিপ চেরি নিজেই স্বীকার করেছেন, শেখ মুজিব হত্যার খবর তিনিই ওয়াশিংটনে পাঠিয়েছিলেন। ১৪-১৫ আগস্টের কালরাতে দূতাবাসের সিনিয়র অফিসাররা অফিসে রাত কাটিয়েছেন। এই ঘটনাই (সব মিলিয়ে) প্রমাণ করে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের সেই কলঙ্কময়ী রাতে ভোর পর্যন্ত না ঘুমিয়ে ঢাকা মার্কিন দূতাবাস কর্মকর্তারা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব হত্যাকাণ্ড পরিচালনা করেছিলেন। এই হত্যা ষড়যন্ত্রে মার্কিনিদের সাথে পাকিস্তান ও পশ্চিম এশিয়ার দু’একটি মুসলিম রাষ্ট্র বাংলাদেশে তাদের ক্রীতদাসদের দিয়ে ইতিহাসের সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটিয়েছে। নিহত হয়েছেন খেটে-খাওয়া দুঃখী মানুষের নেতা বাংলাদেশের স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান”।
অতঃপর দু’টি উদ্ধৃতি রবিউল আওয়ালের ’বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবঃ ষড়যন্ত্রের শিকার’ শীর্ষক নিবন্ধ থেকে। ”স্বাধীন বাংলাদেশে বিচিত্র খলনায়ক এই মোশতাক চরিত্র। মাথায় টুপি, মুখে মধু, মনভরা ছলনা। মোশতাকের চরিত্রে স্থিরতা বলে কিছু ছিল না। ১৯৫৪ সালে যুক্তফ্রন্টের নমিনেশন না পেয়ে সে আওয়ামী লীগ পারলামেন্টারি পার্টির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে ও কৃষক শ্রমিক পার্টির সরকারে গিয়ে ঢোকে। তার রাজনৈতিক জীবন ছিল পরস্পর-বিরোধিতা, আত্মপ্রতারণা ও ভন্ডামিতে ভরা। সারাজীবন সে ডানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িকতাবাদীদের সমর্থন যুগিয়েছে, কিন্তু ব্যক্তিগত সুবিধার জন্য আওয়ামী লীগের প্রগতিশীল অংশটির সাথে থেকেছে। কারো কারো মতে- তাকে (আওয়ামী লীগের প্রগতিশীল অংশে) রাখা হয়েছিল। প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠী তাকে ট্রয়ের ঘোড়ার মত ব্যবহার করেছে। তার সবচেয়ে বড় বিশ্বাসঘাতকতা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময়। সে মাহবুব আলম চাষী, তাহেরউদ্দিন ঠাকুর প্রমুখকে সাথে নিয়ে ওয়াশিংটনের সাথে যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা করে। মুক্তিযুদ্ধ বানচাল করে- পাকিস্তানের সাথে ’কনফেডারেশন’ গঠন করাই ছিল এই চক্রের লক্ষ্য। কোলকাতার সার্কাস অ্যাভিনিউ আর থিয়েটার রোড আমেরিকানদের সাথেই মোশতাক, হোসেন আলী, চাষী, ঠাকুরদের ঘন ঘন ওঠা বসা। এই দলের সাথে যুক্ত হয়েছেন কর্ণেল ওসমানী। একটা ক্ষেত্রে মোশতাকের সঙ্গে কর্ণেল ওসমানীর মিল। দু’জনেই ভারতের প্রতি বীতশ্রদ্ধ। দু’জনেরই মাখামাখি ব্রিটিশ ও আমেরিকান সাহায্য সংস্থার লোক, কূটনৈতিক ও সাংবাদিকদের সঙ্গে”।
১০ জানুয়ারী ১৯৭২, মার্কিন প্রেসিডেন্ট নিক্সন বলেছিলেন, ”আমরা একটি নতুন পদ্ধতির উন্নয়ন করতে যাচ্ছি, যা হবে বাংলাদেশপন্থী, ভারতপন্থী, পাকিস্তানপন্থী এবং সর্বোপরি শান্তিপন্থী”। নিক্সনের এ কথাটিকে ’সোনার পাথরবাটি’ বানানোর খায়েশ ছাড়া আর কিছু বলা যায় কি? প্রকৃতপক্ষে নিক্সন সরকার তখন এসব কোনো দেশের প্রতিই সহানুভূতিশীল বা আন্তরিকভাবে দায়িত্বশীল ছিল না। পাকিস্তানি সেনা-কারাগারে বঙ্গবন্ধুর বেঁচে থাকার বিষয়টিতে ”মার্কিনিরা কৃতিত্ব দাবি করে। কিন্তু ঢাকায় তাঁর বিজয়ীর বেশে প্রত্যাবর্তন তাদের গর্বে (এবং অবশ্যই আত্মবিশ্বাসে) আঘাত হানে। কিসিঞ্জারের সাবেক সহকারী রজার মরিস মনে করেন- ঢাকায় প্রত্যাবর্তনের সময় বঙ্গবন্ধু যে বীরের সম্বর্ধনা পান, তা ছিল সম্ভবত (কিউবার ফিদেল) ক্যাস্ট্রোর ট্যাংকে চড়ে হাভানায় প্রবেশের পর মার্কিন বৈদেশিক নীতির হতবুদ্ধিতার একমাত্র পর্ব”।
এ আলোচনায় প্রাসঙ্গিকতার কারনেই বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা, জিয়ার কথা কিছু উল্লেখ করতেই হয়। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় জিয়া ”একজন সাধারণ মেজর হলেও দেশ স্বাধীন হবার পরই তার উন্নতির সদর দরজাটি খুলে যায়। কর্ণেল-ব্রিগেডিয়ার-মেজর জেনারেল হলেন। ১৯৭২ সালেই বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর উপাধ্যক্ষ। আর বঙ্গবন্ধু হত্যার মধ্য দিয়ে খুনিরা ১৯৭৫ সালের ২০ আগস্ট তাঁকে একেবারে সেনাবাহিনীর শীর্ষ পদে বসিয়ে দিল। মাত্র চার বছরের ব্যবধানে বাংলাদেশের রাজদণ্ডটি কার্যত তার হাতে এসে গেল। জেনারেল জিয়া অত্যন্ত কৌশলী ও সুচতুর ব্যক্তি ছিলেন। তার পথের কাঁটা একে একে সরাতে লাগলেন। সরকারি দলিলপত্রে প্রকাশ, ১৯৭৭ সালের ৯ অক্টোবর থেকে দু’মাস কালের মধ্যে মোট ১,১৪৩ জনকে ফাঁসি দেওয়া হয়। ১৯৭৭ সালের মার্চ মাসে লন্ডন থেকে প্রকাশিত এক নিবন্ধে মার্ক টালি বলেন, ব্রাদার অফিসারদের হত্যার নির্দেশ দেওয়ার আগে সে সারারাত জেগে কোরান তেলাওয়াত করে”।
”কর্ণেল (অব) তাহের ছিলো জিয়ার ঘনিষ্ট জনদের একজন। জীবনদাতা বললেও অত্যুক্তি হবে না। স্বার্থের তাগিদে জে. জিয়া তাহেরকে ফাঁসিতে ঝুলাতে একটুও দ্বিধা করেনি”। ১৯৭৩ সালের গোড়ার দিকে টাঙ্গাইলে রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের একটি গোপন সম্মেলন। আলোচ্য বিষয় ছিল : বাংলাদেশের সে সময়কার রাজনৈতিক অবস্থা। বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনার পর উপস্থিত নেতৃবৃন্দ একটি সিদ্ধান্তে আসেন। এই প্রশাসনকে পাল্টাতে হবে। কি ভাবে? জনৈক বীর গেরিলা যোদ্ধার জবাব : বঙ্গবন্ধুকে বাঁচিয়ে রেখে। জিয়ার এক্ষেত্রে উল্টো সুর। তিনি বললেন, না, তাহলে হবে না। মুজিবকে বাঁচিয়ে রাখলে সবকিছু পন্ড হয়ে যাবে। এ প্রশ্নেই বৈঠক ভেঙে যায়”। মুজিব-হত্যার পরে, ১৯৭৬ সালের ২ আগস্ট ব্রিটেনের আই-টিভি মুজিব-হত্যা সম্পর্কে মেজর ফারুক ও মেজর রশীদের একটি সাক্ষাৎকার প্রচার করেছিল। ম্যাসকারেনহাস গৃহীত ঐ সাক্ষাৎকারে ”ফারুক স্বীকার করে, ১৯৭৫ সালের ২০ মার্চ সন্ধ্যাবেলা রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের জন্য মেজর জেনারেল জিয়ার সঙ্গে সে সাক্ষাৎ করে। জিয়াকে সে বলে, ’আমরা জুনিয়র অফিসাররা (মুজিব হত্যার) সব ঠিক করে ফেলেছি। আমরা আপনার সমর্থন ও নেতৃত্ব চাই। জিয়ার মন্তব্য ছিল : ’আমি একজন সিনিয়র অফিসার। এ ধরনের ব্যাপারে আমি জড়িত হতে পারি না। তোমরা জুনিয়র অফিসাররা যদি এটা করতে চাও, এগিয়ে যাও’। জিয়াউর রহমান ক্ষমতা দখল করার পর (সামরিক) ফরমান জারি করে বাংলাদেশের চার মূলনীতি নাকচ করে সামরিকতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন”। মুজিব-জীবনের অন্তিম ঘটনাবলী অনুধাবনের জন্য এ-সকল তথ্যের অপরিহার্যতা অনস্বীকার্য।
আবুদল গাফফার চৌধুরী জানিয়েছেন, ১৯৭৩ সালের শেষ দিকে তিনি প্রথম লক্ষ্য করেছিলেন, ”বঙ্গবন্ধু তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুর কথা ভাবছেন এবং বলছেন। মৃত্যুতে তাঁর ভয় ছিল না। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য যে কাজ তিনি করতে চান, আততায়ীর গুলি হয়তো শেষ পর্যন্ত তাঁকে তা করতে দেবে না, এমন একটা শঙ্কা তিনি পোষণ করতে শুরু করেছিলেন। এই প্রথম তাঁর মুখে একটা চক্রান্তের ইঙ্গিত পেলাম। জিজ্ঞাসা করলাম : আপনি কি সত্যি সত্যি ভাবছেন, কেউ আপনাকে হত্যা করতে চায়? মুজিব বললেন, তুমি সাংবাদিক, তোমাকে এ কথা মুখ ফুটে বলতে হবে কেন? তুমি কি বুঝতে পার না, কারা আমাকে হত্যা করতে চায়? এবং কেন চোয়? ১৯৭৩ সালে মুজিব গেলেন আলজিয়ার্সে জোট নিরপেক্ষ শীর্ষ সম্মেলনে। সঙ্গে আমাকেও যেতে হল। ক্যাস্ট্রোর (কিউবার প্রেসিডেন্ট) ব্যক্তিগত নিরাপত্তার কঠোর ব্যবস্থা দেখে মুজিব একদিন বিস্ময় প্রকাশ করেছিলেন। বলেছিলেন ক্যাস্ট্রো অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা। তাঁর কি এত কঠোর প্রহরা দরকার? একজন ’এইড’ বললেন, ক্যাস্ট্রোকে খুন করার চক্রান্ত কয়েকবার হয়েছে। এই চক্রান্তের পেছনে সিআইএ’র হাত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই প্রথমবার দেখলাম সিআইএ’র নামে মুজিব একটু ম্লান হয়ে গেলেন। কিছুদিন পরেই চিলির প্রেসিডেন্ট আলেন্দে নিহত হলেন সামরিক অভ্যুত্থানে। মুজিব বললেন : ’আলেন্দে নিহত হয়েছেন খবরটা শোনার পর থেকেই আমি খুব অস্বস্তি বোধ করছি’। শেখ মুজিবের যে নির্ভয়-চরিত্র ও প্রকৃতির সঙ্গে আমার পরিচয়, সেখানে বহুদূরের চিলির ঘটনায় তাঁকে শঙ্কাবোধ করতে দেখে বিস্ময় বোধ করেছি।
১৫ এপ্রিল ১৯৭৪, কোলকাতার প্রেসক্লাবে আবদুল গাফফার চৌধুরীর সাক্ষাৎ আলোচনা হয়েছিল চিলির নিহত (সিআইএ-পরিকল্পনায়) প্রেসিডেন্ট সালভাদর আলেন্দের পত্নী মিসেস আলেন্দের। আলেন্দে-মুজিব এবং বাংলাদেশ সম্পর্কিত আলোচনায় মিসেস আলেন্দে বলেছিলেন : ”এটা সিআইএর একটা সেট প্যাটার্ন। কোন পপুলার গভরমেন্টকে ওরা ধ্বংস করার জন্য প্রথমে সেই দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ভেঙে দেয়। নানা গোলমাল শুরু করে। শ্রমিক ধর্মঘট উস্কে দেয়। ধর্মীয় উত্তেজনা সৃষ্টি করে। এইভাবে পপুলার নেতা বা গভরমেন্টের জনপ্রিয়তা নষ্ট করে দিয়ে তারপর খুনখারাপি শুরু করে। তারপর ধীরে ধীরে মিলিটারির মধ্য থেকে ওদের বাছাই করা লোকটাকে ফ্যাসিস্ট ডিক্টেটরের আসনে বসিয়ে দেয়। এইভাবে কঙ্গোতে ওরা লুলুম্বাকে মেরে বসিয়েছে মবুতুকে। ইন্দোনেশিয়ায় সুকর্ণকে সরিয়ে বসিয়েছে সুহার্তোকে। চিলিতে আলেন্দেকে মেরে বসিয়েছে পিনোচেকে। জানি না তোমাদের মুজিবের ভাগ্যে কি আছে?”
সকলেই জানেন, বঙ্গবন্ধু কৈশোরকাল থেকেই কখনো পালানোর রাজনীতি করেননি। বিখ্যাত সাংবাদিক শফিকুর রহমান বর্ণনা করেছেন বঙ্গবন্ধুর জীবনের অন্তিম পর্বের কথা : ”১৯৭৫-এর ১৫ আগস্ট রাতেও ঘাতকরা পাকিদের মতই গুলি চালাতে চালাতে যখন বাসভবনে ঢূকেছিল তখনো তিনি পেছনের দরজা দিয়ে পালাবার চেষ্টা করেননি, বরং সামনের দরজা খুলে একইভাবে ‘What do you want’ বলতে বলতে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছিলেন। মুখোমুখি হবার সাথে সাথে নূর হুদার হাত থেকে অস্ত্র পড়ে গিয়েছিল। জল্লাদ হাবিলদার মোসলেম অস্ত্র তুলে গুলি চালিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর বুক ঝাঁঝরা হয়ে গেল”। ঘাতকের বুলেট লেগেছিল বঙ্গবন্ধুর বুকে, ভীত কিংবা পলায়ণপর মানুষের মত পিঠের ওপর নয়। এভাবেই সমাপ্ত হলো একটি মহাজীবন- বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।
জাতীয়-আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে হত্যা-প্রচেষ্টার খবরটি বঙ্গবন্ধুর আদৌ অজানা ছিল না, অতি সম্প্রতি প্রকাশিত ’উইকিলিকস তথ্য’ থেকেও তা’ স্পষ্ট হয়েছে। ”বঙ্গবন্ধুকে আগেও হত্যার চেষ্টা হয়েছিল” শিরোনামের খবরটিতে (জনকন্ঠ, ১৪-০৩-২০১৩) বলা হয়েছে : ১৫ আগস্ট ১৯৭৫, ”বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করার আগেও একবার তাঁকে হত্যার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু সে সময় সরকারের কঠোর বিধিনিষেধের কারণে এ নিয়ে বাংলাদেশের সংবাদ মাধ্যমে কোন রিপোর্ট প্রকাশ করা সম্ভব হয়নি। তখন ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে ওয়াশিংটনে পাঠানো এক তারবার্তার তথ্যানুযায়ী ২১ মে (১৯৭৫) সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্ট মুজিবুর রহমান হত্যাচেষ্টার টার্গেট ছিলেন বলে দুটি রিপোর্ট আমাদের হাতে এসেছে। এ তথ্যের মূল উৎস ছিল ঢাকার মার্কিন দূতাবাসের এক বাঙালি রাজনৈতিক সহযোগী। আরেকজন হচ্ছেন সাংবাদিক, যিনি তথ্য অফিসার (মার্কিন দূতাবাস) এলপার্নকে এ খবর দিয়েছেন।
দুটি বিবরণেই হামলায় গ্রেনেড ব্যবহারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। হত্যা প্রচেষ্টায় মুজিব অক্ষত থাকলেও অজ্ঞাত দুই ব্যক্তি আহত হয়েছেন। নিক্সন প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের কারণে যুক্তরাষ্ট্র ও মুজিবের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছিল। মুক্তিযুদ্ধে যখন পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে তখনও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের এ টানাপোড়েন অব্যাহত ছিল”। সুতরাং এমন বিশ্বাসই যুক্তিসঙ্গত যে, মুজিব জানতেন তাঁর জীবনের ওপর আসন্ন হুমকির কথা, কিন্তু তিনি ভয়ে-ভীরুতায় নত না হয়ে ব্যক্তিগত সাহস আর আত্মবিশ্বাসের অবস্থান থেকেই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে চেয়েছিলেন। সব মিলিয়ে এমন ধারণাই সঠিক মনে হয় যে, সবকিছু জানার পরেও তাঁর জনগণের ওপর, মানুষের ওপর তিনি বিশ্বাস হারাননি।