অনলাইন ডেস্ক :: ২০০৯ সালের ভয়াবহ বিডিআর হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম মর্মান্তিক ও স্পর্শকাতর ঘটনা। দীর্ঘ দেড় দশক পর এই ঘটনার তদন্তে নতুন করে গঠিত জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদন দেশে-বিদেশে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। ভুক্তভোগী পরিবার, পর্যবেক্ষক মহল ও প্রশাসনের ভেতরের সূত্রের দাবি—এই প্রতিবেদনটি ভুয়া, প্রতিহিংসাপ্রসূত ও রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
প্রতিবেদনের খসড়া প্রকাশ্যে আসতেই প্রশাসনে আলোড়ন শুরু হয়। কারণ, সেখানে দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার অভিযোগে বর্তমান পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলমসহ পাঁচ পুলিশ কর্মকর্তার নাম উঠে এসেছে। সূত্র জানায়—এই অভিযোগগুলোকে অনেকেই “অসঙ্গত, বিভ্রান্তিকর এবং রাজনৈতিকভাবে প্রভাবিত” হিসেবে দেখছেন।
*প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ*
ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর দাবি অনুযায়ী, কমিশন যে রিপোর্ট দিয়েছে তা–
ভারতকে দায়ী করেছে,
আওয়ামী লীগকে দায়ী করেছে,
সাংবাদিকদের দায়ী করেছে,
পুলিশকে দায়ী করেছে,
এমনকি সেনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে,
কিন্তু যারা হত্যাকাণ্ডে সরাসরি জড়িত ছিল বলে আদালতে দণ্ডিত হয়েছে, তাদের বিষয়ে প্রতিবেদনে “অস্বাভাবিক নমনীয়তা” দেখানো হয়েছে। পরিবারগুলোর ভাষ্যএটি অপরাধীদের রক্ষার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে।
তারা মনে করেন, বিচারিক প্রক্রিয়ায় দোষী সাব্যস্ত হওয়ার পরও ওই অপরাধীদের বাঁচাতে সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে একটি বিতর্কিত কমিশন গঠন করেছে এবং “মনগড়া” রিপোর্ট তৈরি করেছে।
*আইজিপি বাহারুল আলমকে ঘিরে আলোচনা*
স্পর্শকাতর প্রতিবেদনে আইজিপির নাম আসার পর প্রশাসনের ভেতরে নানামুখী আলোচনা চলছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে—তিনি অতীতে পুলিশের বিশেষ শাখায় (এসবি) দায়িত্ব পালনকালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে ভূমিকা রেখেছেন এবং বিরোধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সক্রিয় ছিলেন।
*বিচারের ইতিহাস ও নতুন বিতর্ক*
২০০৯ সালের ২৫–২৬ ফেব্রুয়ারি পিলখানায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে ৭৪ জন সেনা সদস্য নিহত হন। আদালত ১৩৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড, ১৮৫ জনকে যাবজ্জীবন এবং আরও ২২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদের সাজা দেন।
এই বিচার নিয়ে শুরু থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বিভিন্ন সময় প্রশ্ন তুললেও, তারা এখন আরও বেশি ক্ষুব্ধ—
তাদের অভিযোগ, “বহিঃশক্তি” ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের নাম করে আসল অপরাধীদের আড়াল করার চেষ্টা চলছে।
গত বছরের ২৪ ডিসেম্বর গঠিত সাত সদস্যের জাতীয় স্বাধীন তদন্ত কমিশন ৩০ নভেম্বর প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে দাবি করা হয়—
বিডিআর হত্যাকাণ্ড ছিল পরিকল্পিত,
বহিঃশক্তির সংশ্লিষ্টতা ছিল “স্পষ্ট”,
তৎকালীন ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের একাধিক শীর্ষ নেতার ভূমিকা ছিল,
এবং প্রধান সমন্বয়কের ভূমিকা allegedly পালন করেছেন সাবেক মেয়র ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস।
এই দাবিগুলোকে ভুক্তভোগী পরিবার “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলেই মনে করছে।
বিডিআর হত্যাকাণ্ডের মতো জাতীয় ট্র্যাজেডিকে কেন্দ্র করে নতুন করে তৈরি হওয়া এই তীব্র বিতর্ক আবারও স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে— সত্য উদঘাটনে নিরপেক্ষতা, স্বচ্ছতা ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত তদন্ত ছাড়া ন্যায়বিচার সম্ভব নয়।