নিউজ ডেস্ক :: দক্ষিণ এশিয়ার নিরাপত্তা বাস্তবতায় ভারতের উত্তর–পূর্বাঞ্চল—যা ‘সেভেন সিস্টার’ নামে পরিচিত দীর্ঘদিন ধরেই ভূ-রাজনৈতিকভাবে স্পর্শকাতর। সাম্প্রতিক সময়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও আঞ্চলিক পর্যবেক্ষকদের একাংশের আশঙ্কা, বাংলাদেশভিত্তিক কয়েকটি উগ্রবাদী ও জঙ্গি নেটওয়ার্ক এই অঞ্চলকে লক্ষ্য করে নতুন করে তৎপরতা বাড়াচ্ছে। প্রকাশ্য বক্তব্য, প্রতীকী শপথ, অনলাইন প্রচারণা এবং সংগঠিত বক্তব্যে ভারতের সার্বভৌমত্ববিরোধী ভাষা ব্যবহার এই উদ্বেগকে আরও জোরালো করছে।
নিরাপত্তা সূত্র ও বিশ্লেষকদের মতে, এসব তৎপরতার সঙ্গে যেসব গোষ্ঠীর নাম ঘুরে ফিরে আসছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে জামাআতুল মুজাহিদিন বাংলাদেশ (জেএমবি), হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামি (হুজি), আনসার আল ইসলাম, হিজবুত তাহরির, এবং আন্তর্জাতিকভাবে নিষিদ্ধ আইএস (ইসলামিক স্টেট)-এর আদর্শিক প্রভাবযুক্ত নেটওয়ার্ক। এছাড়া, কট্টরপন্থী সামাজিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে পরিচিত হেফাজতে ইসলাম এর কিছু বক্তব্য ও আন্দোলনের ভাষার সঙ্গে এসব উগ্র গোষ্ঠীর বয়ানের সাযুজ্য নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন পর্যবেক্ষকরা।
এই গোষ্ঠীগুলোর বক্তব্যে একটি মিল স্পষ্ট—ভারতের উত্তর পূর্বাঞ্চলকে “কৌশলগতভাবে দুর্বল” বা “বিচ্ছিন্নযোগ্য অঞ্চল” হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা। বিশ্লেষকদের মতে, এ ধরনের ভাষা নিছক মতাদর্শগত বক্তব্য নয়; বরং এটি আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা উসকে দেওয়ার একটি পরিচিত কৌশল। দক্ষিণ এশিয়ার ইতিহাসে দেখা গেছে, সেভেন সিস্টার অঞ্চলে অস্থিরতা তৈরি হলে তার প্রভাব প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তাতেও পড়ে।
উদ্বেগের বড় কারণ হলো এই জঙ্গি নেটওয়ার্কগুলোর ক্রমবর্ধমান আত্মবিশ্বাস। পর্যবেক্ষকদের ভাষায়, উগ্রবাদীরা তখনই বেপরোয়া হয়, যখন তারা রাষ্ট্রকে দ্বিধাগ্রস্ত বা নীতিগতভাবে দুর্বল মনে করে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে প্রশাসনিক অস্থিরতা, নীতিগত অস্পষ্টতা এবং কার্যকর নজরদারির ঘাটতির অভিযোগ এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছে যার সুযোগ নিচ্ছে চরমপন্থী শক্তি। প্রকাশ্যে হুমকি, সমাবেশে উসকানিমূলক বক্তব্য এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংস ভাষা ব্যবহারে কোনো ভয় না থাকা সেই বাস্তবতারই প্রতিফলন।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো রাষ্ট্রের ভেতরের কিছু অংশের নীরব নিষ্ক্রিয়তা। নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের একাংশ বলছেন, উগ্রবাদী তৎপরতার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ও ধারাবাহিক প্রতিরোধ না থাকলে সেটি কার্যত পরোক্ষ প্রশ্রয় হিসেবেই বিবেচিত হয়। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু স্তরে ঢিলেঢালা মনোভাব বা রাজনৈতিক চাপের অভিযোগ রাষ্ট্রের কঠোর অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এই প্রেক্ষাপটে বিদেশি সংযোগের আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। পাকিস্তানভিত্তিক চরমপন্থী নেটওয়ার্কের সঙ্গে হুজি ও জেএমবির অতীত যোগাযোগ, আন্তর্জাতিক জিহাদি আদর্শের সঙ্গে আইএস–ঘনিষ্ঠ প্রচারণা এবং মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ এশিয়ার কিছু উৎস থেকে অর্থ ও লজিস্টিক সহায়তার অভিযোগ সব মিলিয়ে বিষয়টি আর কেবল অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি সরাসরি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকেও বিষয়টি স্পষ্টতই স্পর্শকাতর। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের ভূখণ্ড থেকে যদি সেভেন সিস্টারকে লক্ষ্য করে উসকানিমূলক বক্তব্য বা সংগঠিত তৎপরতা পরিচালিত হয়, তবে তা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ওপর গুরুতর চাপ সৃষ্টি করে। বাংলাদেশ, যা দীর্ঘদিন নিজেকে দায়িত্বশীল প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরেছে, এমন অভিযোগের মুখে পড়লে তার আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতাও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতিতে কেবল অস্বীকার বা নীরবতা যথেষ্ট নয়। জঙ্গি গোষ্ঠীগুলোর নাম, নেটওয়ার্ক ও অর্থনৈতিক–লজিস্টিক উৎস নিয়ে স্বচ্ছ ও স্বাধীন তদন্ত, উগ্রবাদবিরোধী আইনের নির্বাচনমূলক নয় বরং সর্বজনীন প্রয়োগ, এবং প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে খোলামেলা কূটনৈতিক যোগাযোগ—এসবই এখন সময়ের দাবি।
ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, উগ্রবাদকে অবহেলা করলে বা রাজনৈতিক হিসাবের কারণে সহনশীলতা দেখালে তার পরিণতি কখনো সীমিত থাকে না। সেভেন সিস্টারকে ঘিরে যে ভাষা ও তৎপরতা আজ দেখা যাচ্ছে, তা যদি এখনই দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা না করা হয়, তবে তার অভিঘাত শুধু বাংলাদেশ বা ভারতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না তা দক্ষিণ এশিয়ার সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলবে।
এই বাস্তবতায় স্পষ্ট বার্তা একটাই উগ্রবাদ দমন কোনো কূটনৈতিক সৌজন্য নয়, এটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নীরবতা এখানে নিরপেক্ষতা নয় নীরবতা নিজেই ঝুঁকি।