নিউজ ডেস্ক :: এনসিপির সাম্প্রতিক কিছু সিদ্ধান্ত দলটাকে বড় ধরনের সংকটের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা নেতাদের মানুষ দেখেছিল নতুন আশা আর সাহসী বিকল্প হিসেবে। কিন্তু দল গঠনের পর থেকেই সেই আস্থায় নিজেরাই ফাটল ধরাচ্ছে তারা। রাজনীতি করতে দল করা দোষের কিছু না, কিন্তু মানুষ যে ভরসা নিয়ে ছাত্র নেতাদের পাশে দাঁড়িয়েছিল, সেটা ছিল পুরোনো ধাঁচের দলীয় রাজনীতির বাইরে থাকার প্রত্যাশা। সেই জায়গা ছেড়ে আসাটাই ছিল এনসিপির সবচেয়ে বড় ভুল।
নাহিদ, মাহফুজ ও সজীব ভুইয়া সরকার থেকে পদত্যাগ করেছিলেন—অনেকে ভেবেছিল এটা সত্যিই জনগণের স্বার্থে রাজনীতি করার সাহসী পদক্ষেপ। কিন্তু যদি সেই পদত্যাগ জনস্বার্থের জন্য হতো, তাহলে সবচেয়ে শক্ত বার্তা হতো সবাই মিলে এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা। এমন ঘোষণা দিলে অল্প সময়েই এনসিপির প্রতি জনসমর্থন বহুগুণে বাড়তে পারত। সেই সুযোগ তারা নিজেরাই নষ্ট করেছে।
এককভাবে নির্বাচন না করে জামায়াতের সঙ্গে জোটে যাওয়ার সিদ্ধান্ত এনসিপির ভাবমূর্তিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এখানে নেতৃত্বের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল এটা না বোঝা যে—এনসিপিতে শুধু জামায়াত আদর্শের নেতা-কর্মীরাই নেই, বরং ভিন্ন মত, ভিন্ন আদর্শ ও ভিন্ন রাজনৈতিক চিন্তার বহু মানুষ এই দলে যুক্ত হয়েছেন। জোটের এই সিদ্ধান্তে সেই বহুমতের জায়গাটা উপেক্ষিত হয়েছে, ফলে অনেকেই নিজেদের দলে অস্বস্তিকর ও অপ্রাসঙ্গিক মনে করছেন।
এর ফল আজ স্পষ্ট দলের ভেতরে কোন্দল, নেতাকর্মীদের দল ছাড়ার হিড়িক, আর সংগঠনের ভিত নড়ে যাচ্ছে। সত্যি কথা বলতে গেলে, জোটে না গেলে এনসিপি এত দ্রুত ভাঙনের মুখে পড়ত না।
আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা এনসিপির নেতৃত্বের বোঝা জরুরি ছিল। আওয়ামী লীগ–বিএনপি–জামায়াত দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক মাঠে একক আধিপত্য ধরে রাখতে চায়। নতুন কোনো শক্তিকে যদি তারা নিজেদের জন্য হুমকি বা থ্রেট মনে করে, তাহলে তারা কখনোই সেই শক্তির ঐক্য বা বিকাশ চায় না। এই বাস্তবতায় এনসিপিও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদীয়মান রাজনৈতিক দল। ফলে অন্যদের রাজনৈতিক খেলায় পা না দিয়ে, নিজেদের স্বতন্ত্র শক্তি ও ঐক্য ধরে রাখাই ছিল সবচেয়ে জরুরি।
সবচেয়ে হতাশার জায়গা হলো নেতৃত্বের আত্মসমালোচনার অভাব। ভুল সিদ্ধান্তের দায় কেউ নিতে চায় না, অথচ মাঠে কাজ করা কর্মীরাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। রাজনীতিতে কৌশল থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের আস্থা হারিয়ে কোনো কৌশলই শেষ পর্যন্ত কাজে আসে না।
এখনও যদি এনসিপি টিকে থাকতে চায়, তাহলে আর সময় নষ্ট করার সুযোগ নেই। ভুল স্বীকার করতে হবে, আদর্শিক অবস্থান পরিষ্কার করতে হবে, প্রশ্নবিদ্ধ জোট রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দলকে কয়েকজনের হাতে বন্দি না রেখে বহুমত ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর দিকে ফিরতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা—ক্ষমতার লোভ নয়, মানুষের আস্থাকেই রাজনীতির মূল শক্তি বানাতে হবে। না হলে এনসিপির নাম ইতিহাসে লেখা থাকবে আরেকটা ব্যর্থ রাজনৈতিক পরীক্ষার গল্প হিসেবে—একটা বড় সুযোগ নষ্ট করার উদাহরণ হয়ে।