দিনপত্র ডেস্ক :: রাষ্ট্র আজ যে সিদ্ধান্তসমূহ গ্রহণ করছে, তা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে জনগণের ভোটাধিকার হরণ করেই অবৈধভাবে ক্ষমতা কায়েমের একটি সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। বাংলাদেশের সংবিধান, প্রচলিত আইন ও গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার মৌলিক নীতিসমূহকে প্রকাশ্যে উপেক্ষা করেই এই প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। সংবিধান যে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন এই সত্যকে অস্বীকার করেই বর্তমান শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা কুক্ষিগত রাখার লক্ষ্যে রাষ্ট্রযন্ত্রকে দলীয় হাতিয়ারে পরিণত করেছে।
সংবিধানের প্রস্তাবনা ও মৌলিক অনুচ্ছেদসমূহে জনগণের সার্বভৌমত্ব, আইনের শাসন এবং অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের যে নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে তার সম্পূর্ণ বিপরীত একটি চিত্র আজ জাতির সামনে তুলে ধরা হচ্ছে। জনগণকে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত করে, বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিকে নির্বাচন প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরিয়ে রেখে একটি সাজানো ও প্রহসনমূলক নির্বাচন চাপিয়ে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে, যা সরাসরি সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল।
রাষ্ট্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা কোনো ব্যক্তি বা রাজনৈতিক দলের কর্মচারী নন তারা সংবিধান অনুযায়ী প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী। তাদের সাংবিধানিক দায়িত্ব হলো সংবিধান ও আইনের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখা এবং জনগণের স্বার্থ সংরক্ষণ করা। অথচ আজ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হচ্ছে। সংবিধানবিরোধী নির্দেশ বাস্তবায়নের মাধ্যমে এসব কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একটি অবৈধ রাজনৈতিক প্রকল্পের অংশীদার বানানো হচ্ছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যারা ক্ষমতার অপব্যবহারে সহযোগিতা করে, তারাও একদিন অবৈধ শাসনের সহযোগী হিসেবে চিহ্নিত হন এবং জবাবদিহির আওতায় আসেন।
একটি নির্দিষ্ট দলকে পুনরায় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত রাখার উদ্দেশ্যে সরকারের এই ষড়যন্ত্র এখন আর গোপন নয়। বিরোধী রাজনৈতিক দল ও মতকে দমন করতে মামলা, গ্রেপ্তার, গুম, হয়রানি ও ভয়ভীতি প্রদর্শনকে রাষ্ট্রনীতি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ জনগণের সমর্থন রয়েছে—এমন রাজনৈতিক দলকে কার্যত নির্বাচনের বাইরে রেখে তথাকথিত নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, যা সাংবিধানিক গণতন্ত্রের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং জনগণের ভোটাধিকার হরণের সুস্পষ্ট প্রমাণ।
সংবিধানের ১১, ৫৫, ৫৬ ও ৬৫ অনুচ্ছেদে জনগণের প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার, সংসদের কার্যকর ভূমিকা এবং জনগণের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই সাংবিধানিক কাঠামো সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়েছে। নির্বাচন কমিশন তার সাংবিধানিক স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা বিসর্জন দিয়ে সরকারের আজ্ঞাবহ প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এই পরিস্থিতিতে আয়োজিত কোনো নির্বাচনই বৈধতা পেতে পারে না বরং এটি একদলীয় শাসন কায়েমের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হবে।
গণতন্ত্রের নামে এই প্রহসন কেবল রাজনৈতিক অধিকার হরণেই সীমাবদ্ধ নয় এটি রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎকে গভীর সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক সংকটের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। জনগণের ভোটাধিকার হরণ মানে জনগণের সার্বভৌমত্ব হরণ, আর জনগণের সার্বভৌমত্ব হরণ মানেই রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ভিত্তি ধ্বংস করা।
ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে অবৈধ ক্ষমতা কখনো চিরস্থায়ী হয় না। যারা আজ সংবিধানকে পদদলিত করে ক্ষমতা আঁকড়ে ধরতে চায়, এবং যারা সুযোগসন্ধানী হয়ে এই অবৈধ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তাদের সবাইকে একদিন অবশ্যই বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। জনগণের আদালত, ইতিহাসের আদালত কিংবা আইনের আদালত কোনো না কোনো আদালতে তাদের জবাবদিহি করতেই হবে।
গণতন্ত্র, সংবিধান ও জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা অবশ্যম্ভাবী। আর সেই সঙ্গে অবৈধ শাসনের অবসানও অনিবার্য।