দিনপত্র ডেস্ক :: বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্যতম বৃহৎ ও কৌশলগত স্থাপনা মাতারবাড়ি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র। সেই গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রেই ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে যায়। অথচ জাতীয় গণমাধ্যমে নেই তেমন আলোচনার তোড়জোড়, নেই অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, নেই রাষ্ট্র ও কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহির প্রশ্ন। এই নীরবতা শুধু বিস্ময়কর নয় এটি সরাসরি জননিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় স্বচ্ছতার জন্য হুমকি।
এই নিশ্চুপতা কোনো একক ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত প্রতিদিনই ঘটছে খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি, চুরি, প্রতারণা, জবরদখল এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিরীহ মানুষের ওপর নির্যাতন। কিন্তু অধিকাংশ ঘটনাই হয় সংক্ষিপ্ত খবরে চাপা পড়ে, নয়তো আদৌ প্রকাশ পায় না। ফলে অপরাধ ক্রমেই “স্বাভাবিক” হয়ে উঠছে, আর অপরাধীরা পাচ্ছে নীরব উৎসাহ ও অদৃশ্য প্রশ্রয়।
সংবাদ যখন আড়াল করা হয়, তখন অপরাধ বাড়ে এটি কোনো মতামত নয়, এটি বাস্তবতা। মিডিয়া যখন তার দায়িত্ব পালন করতে ব্যর্থ হয়, তখন জনগণের আস্থা ভেঙে পড়ে। মানুষ ভাবতে শুরু করে সংবাদ মানেই সত্য নয়, সত্য মানেই সংবাদ নয়। এই অনাগ্রহ থেকেই জন্ম নিচ্ছে ভয়ংকর এক শূন্যতা, যেখানে বিশৃঙ্খলা চরমে ওঠে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর জমতে থাকে গভীর ক্ষোভ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই নীরবতার সুযোগ নিচ্ছে এক শ্রেণির আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য। ঘটনার গভীরে না গিয়ে দায় এড়িয়ে যাওয়া, “সব নিয়ন্ত্রণে” বলে পরিস্থিতি ধামাচাপা দেওয়া কিংবা ক্ষমতাবানদের রক্ষা করার অভিযোগ আজ আর বিচ্ছিন্ন নয়। মিডিয়া প্রশ্ন না করায় জবাবদিহির জায়গাটুকুও ক্রমেই বিলীন হয়ে যাচ্ছে। দায়িত্বপালনের বদলে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে দায়মুক্তির সংস্কৃতি।
গণমাধ্যম কোনো দলের মুখপাত্র নয়, কোনো গোষ্ঠীর ঢালও নয়। গণমাধ্যম হলো জনগণের চোখ ও কণ্ঠ। সেই চোখ বন্ধ থাকলে রাষ্ট্র অন্ধ হয়ে পড়ে, আর কণ্ঠ স্তব্ধ থাকলে অন্যায়ই সবচেয়ে জোরে কথা বলে। আজ যে নীরবতা দেখা যাচ্ছে, তা নিরপেক্ষতা নয় তা কার্যত অন্যায়ের পাশে দাঁড়ানোর নামান্তর।
আজ প্রয়োজন নীরবতা ভাঙার সাহস।
প্রয়োজন অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা, সত্য প্রকাশের দৃঢ়তা এবং ক্ষমতার সামনে প্রশ্ন তোলার স্পষ্ট অবস্থান। অন্যথায় একদিন এই নিশ্চুপ থাকার দায় শুধু মিডিয়ার ঘাড়ে নয় রাষ্ট্র, প্রশাসন ও সমাজ সবাইকে বহন করতে হবে।
নিশ্চুপতা কখনো সমাধান নয়।
নিশ্চুপতা অনেক সময় অপরাধের সবচেয়ে বড় সহচর।
এই সত্য যত দ্রুত আমরা উপলব্ধি করব, তত দ্রুতই হয়তো এই ক্রমবর্ধমান বিশৃঙ্খলার অন্ধকার থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজে পাওয়া যাবে।