নিউজ ডেস্ক :: বিগত সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ের ঘটনা—যে সময়টাকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অদ্ভুত দ্বৈত মানের অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। তখন ক্ষমতাসীন সামরিক প্রশাসনের তীব্র চাপের মুখে বিএনপির জ্যেষ্ঠ ভাইস চেয়ারম্যান তারেক রহমান লিখিতভাবে অঙ্গীকার করেছিলেন—“আমি আর রাজনীতি করবো না।”
সেই মুচলেকার বিনিময়েই তিনি মুক্তি পান, এবং চিকিৎসার অজুহাতে দেশ ছাড়েন। এরপর দীর্ঘ সময় বিদেশে অবস্থান করে তিনি রাজনৈতিক বক্তব্য থেকে নিজেকে দূরে রাখলেও ধীরে ধীরে দলের নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে ফিরে আসেন।
কিন্তু আজ প্রশ্ন উঠছে—যে প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে তিনি স্বাধীনতা ও সুবিধা পেয়েছিলেন, সেই অঙ্গীকার আজ কোথায় হারিয়ে গেল?
রাজনীতি কি কেবল সুবিধা ও পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবহারযোগ্য একটি চুক্তি?
নাকি এটি এমন এক নৈতিক অঙ্গীকার, যার ভঙ্গে জনগণের আস্থা নষ্ট হয়?
*মুচলেকার নৈতিক দায়*
বাংলাদেশের আইনে “মুচলেকা” মানে হচ্ছে শর্তসাপেক্ষ প্রতিশ্রুতি—একটি লিখিত অঙ্গীকার, যা কেউ নিজের ইচ্ছায় দিলে সেটি ব্যক্তিগত ও নৈতিক দায় হিসেবে গণ্য হয়। আদালতের নিয়মও বলে, যদি কেউ মুচলেকা দিয়ে জামিন নেন এবং পরে সেটি ভঙ্গ করেন, তাহলে দ্বিতীয়বার তিনি আর সেই সুবিধা পান না।
এই দৃষ্টান্তে যদি রাজনীতিকে দেখা যায়, তাহলে প্রশ্ন আরও তীব্র হয়—একজন রাজনৈতিক নেতা যদি রাষ্ট্রীয়ভাবে দেওয়া নিজের লিখিত প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন, তবে কি তিনি নৈতিকভাবে জনগণের আস্থা পাওয়ার যোগ্য থাকেন?
তারেক রহমানের ক্ষেত্রে বিষয়টি শুধুমাত্র রাজনৈতিক নয়, নৈতিকতাও এখানে মুখ্য। একজন জাতীয় নেতার কাছ থেকে জনগণ কেবল বক্তৃতা নয়, চরিত্রগত দৃঢ়তাও প্রত্যাশা করে। আর সেই চরিত্রের ভিত্তি হলো প্রতিশ্রুতির প্রতি আনুগত্য।
তারেক রহমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে একসময় “অবৈধ সেনাশাসন” বলে অভিহিত করেছিলেন। সেই সরকারের সময়ই তিনি মুচলেকা দেন এবং দেশ ছাড়েন। আজও দেশে কার্যত নির্বাচনের বাইরে থাকা একটি অনির্বাচিত প্রশাসনিক ধারা চলছে—যার প্রতি তার দল বিএনপি সবসময়ই আপত্তি জানিয়ে আসছে।
কিন্তু একই সময়ে বিদেশে বসে তারেক রহমান সেই সরকারের সময়ের ন্যায় অনির্বাচিত কাঠামোর মধ্যেই দলীয় মনোনয়ন দিচ্ছেন, সংগঠন পুনর্গঠন করছেন।
এই পরস্পরবিরোধী অবস্থান শুধু রাজনৈতিক কৌশলের প্রশ্ন নয়—এটি দলের আদর্শ ও নৈতিক অবস্থানেরও প্রশ্ন তোলে।
রাজনীতিতে নেতৃত্ব মানে শুধু ক্ষমতার নির্দেশ নয়, নৈতিক নেতৃত্বের উদাহরণ স্থাপন।
যে নেতা নিজের প্রতিশ্রুতির প্রতি বিশ্বস্ত থাকতে পারেন না, তার নেতৃত্বে দল টিকলেও জনগণের আস্থা টেকে না।
*প্রতিশ্রুতি হলো রাজনীতির মেরুদণ্ড*
রাজনীতির ইতিহাসে দেখা যায়, যে নেতারা নিজেদের অঙ্গীকারের প্রতি অনড় থেকেছেন, তারাই জনগণের হৃদয়ে স্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মওলানা ভাসানী কিংবা হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী—তারা প্রত্যেকে প্রতিশ্রুতি রক্ষায় ছিলেন আপসহীন।
অন্যদিকে, যাদের কথার সঙ্গে কাজের ফারাক ছিল, তারা ইতিহাসে টেকেননি।
তারেক রহমান একসময় ঘোষণা দিয়েছিলেন “দুর্নীতিমুক্ত ও আধুনিক রাজনীতি”র; কিন্তু নিজের দেওয়া মুচলেকা ভুলে গিয়ে আবার দলীয় নেতৃত্বে সক্রিয় হওয়া সেই ঘোষণার বিপরীত উদাহরণ। রাজনীতি মানে জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসের চুক্তি—আর বিশ্বাস একবার ভাঙলে তা সহজে ফেরে না।
বাংলাদেশের রাজনীতি বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শিকার। ব্যক্তিগত সুবিধা, ক্ষমতার লোভ কিংবা পরিস্থিতির চাপে দেওয়া অঙ্গীকার ভঙ্গ হয়ে যায় সময়ের সঙ্গে। কিন্তু জনগণ ভুলে না—তারা স্মৃতি ধরে রাখে।
তারেক রহমানের দেওয়া “আর রাজনীতি করবো না” মুচলেকা এখন ইতিহাসের দলিলে রয়ে গেছে, কিন্তু সেই প্রতিশ্রুতি ভাঙার দায় বর্তমানেও রাজনৈতিক আলোচনায় ফিরে আসে।
একবার মুচলেকা দিয়ে মুক্তি পাওয়া যায়, কিন্তু দ্বিতীয়বার বিশ্বাস পুনরুদ্ধার করা যায় না।
রাজনীতিতে বিশ্বাস হারালে নেতৃত্ব থাকে কেবল নামের মধ্যে মানুষের মনে নয়।