রাজনৈতিক আধিপত্যে কড়াল বস্তিতে আগুন,কোটি টাকার মাদক অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণে গোপন প্রতিযোগিতা

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক :: রাজনীতির অদৃশ্য নিয়ন্ত্রণ যখন নগর দরিদ্রের জীবনে গাঢ় ছায়া ফেলে, তখন সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় পড়ে সেই মানুষগুলো, যাদের নিরাপত্তা, মৌলিক সেবা বা অধিকার রক্ষার কোনো দৃঢ় কাঠামো নেই। রাজধানীর কড়াল বস্তি গত এক বছরে এমনই এক সংঘর্ষমুখর বাস্তবতার ভেতর দিয়ে গেছে—যেখানে বারবার উঠেছে রাজনৈতিক দখল-বাজি, পরিকল্পিত অগ্নিকাণ্ড, অবৈধ অর্থনীতি এবং ভয়ভীতি সৃষ্টির অভিযোগ।

বস্তি শহরের দুর্বলতম জায়গা, তাই দখলদারদের প্রথম টার্গেট

ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে বস্তি নিয়ন্ত্রণ করা মানেই হাজারো মানুষের ওপর প্রভাব বিস্তার। এখানে—

আইনশৃঙ্খলা নজরদারি দুর্বল,

সরকারি তদারকি বিচ্ছিন্ন,

এবং রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলো ভয় দেখিয়ে খুব সহজেই আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে পারে।

স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, গত এক বছরে বিএনপি–জামায়াত–এনসিপি-ঘনিষ্ঠ একটি চক্র বস্তিতে নিজেদের দখল শক্তিশালী করতে সক্রিয়ভাবে মাঠে নেমেছে। তাদের প্রধান লক্ষ্য—বস্তিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বৃহৎ অর্থনৈতিক প্রবাহকে নিয়ন্ত্রণ করা।

মাসে ২০ কোটি টাকার মাদক অর্থনীতি—দখলযুদ্ধের মূল জ্বালানি

বস্তিকে কেন্দ্র করে মাদক অর্থনীতি নতুন নয়, তবে কড়াল বস্তির হিসাব ভয়ঙ্কর। অভিযোগ রয়েছে—এ এলাকায় প্রতি মাসে প্রায় ২০ কোটি টাকার মাদক ব্যবসা ঘুরে। এর সঙ্গে বাড়তি আয়ের উৎস হিসেবে যুক্ত থাকে—

৫ কোটি টাকার অবৈধ ভাড়া ও চাঁদাবাজি,

২ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল লোপাট,

১.২ কোটি টাকা ওয়াসা বিল গায়েব।

এত বড় অঙ্কের অর্থ যে কোনো রাজনৈতিক বা অপরাধী চক্রের কাছে লোভনীয়। ফলে বস্তিটি স্বাভাবিকভাবেই পরিণত হয়েছে আধিপত্যের সংঘর্ষময় ‘গ্রাউন্ড জিরো’তে।

ক্ষতিগ্রস্তদের দাবি—এগুলো নিছক দুর্ঘটনা নয়, বরং ভূমি দখল ও আধিপত্য প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিতভাবে ঘটানো।
বস্তি এলাকায় আগুন লাগা নতুন কিছু নয়,কিন্তু বারবার একই প্যাটার্নে ঘটনা ঘটার ফলে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছে—

আগুন কি ভয় দেখিয়ে বাসিন্দা উচ্ছেদের হাতিয়ার?

আগুনের পরপরই কি নতুন শক্তি উঠে আসে বস্তি নিয়ন্ত্রণে?

‘ওয়েলফেয়ার’ বা ‘উন্নয়ন’ প্রকল্পের কথা বলে কি জমি দখলের পথ তৈরি হয়?

যে উদ্দেশ্যেই হোক, আগুন মানুষকে শুধু ঘরহারা করে না—তাদের নিরাপত্তাবোধ, আস্থাবোধ এবং প্রতিরোধের শক্তিকেও গভীরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

রাজনৈতিক দখলদার ও অপরাধী গোষ্ঠীর চাপে একদিকে বস্তিবাসী আতঙ্কে দিন কাটায়; অন্যদিকে তাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয় ভুয়া বিল, অবৈধ টোকেন ও চাঁদা।
তারা—

বৈধ সেবা পায় না,

অযৌক্তিক ভাড়া গুনতে হয়,

এবং প্রতিনিয়ত আতঙ্কে থাকে—কখন আবার আগুন লেগে সব পুড়ে যাবে।

এ অবস্থায় বস্তিবাসীর জীবন শুধু অনিশ্চিত নয়; তাদের ভবিষ্যৎও প্রতিদিন সংকুচিত হচ্ছে।

দখল-বাজির পরিণতি—নগর নিরাপত্তার জন্যও বিপজ্জনক

কিছু মানুষের কাছে এটি হয়তো বস্তির ‘ছোট সমস্যা’ মনে হতে পারে। কিন্তু বাস্তবতা হলো—বস্তিতে দখল-বাজির মূল জ্বালানি মাদক অর্থনীতি, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব; আর এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে।
আগুন, সংঘাত, মাদক বিস্তার এবং সন্ত্রাসী কার্যকলাপ শেষ পর্যন্ত নগরের নিরাপত্তার ওপরও বড় হুমকি তৈরি করে।

কড়াল বস্তির ঘটনাপুঞ্জ আমাদের বুঝিয়ে দেয় দারিদ্র্য শুধু অর্থনৈতিক নয় এটি রাজনৈতিকও। যারা সবচেয়ে প্রান্তিক, সবচেয়ে অসহায়—তাদের জীবনই ক্ষমতার খেলায় সবচেয়ে সহজ টার্গেট। অভিযোগের সত্যতা যাচাই করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের, কিন্তু এই বাস্তবতার একটি দিক স্পষ্ট—রাজনৈতিক দখলদারিত্ব যখন শুরু হয়, তখন সবচেয়ে বেশি পুড়ে যায় গরিব মানুষের ঘর, জীবন আর ভবিষ্যৎ।