নিউজ ডেস্ক :: ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র ও জুলাই আন্দোলনের অন্যতম নেতা শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যু কোনো বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয় এটি রাষ্ট্রপরিচালনার ব্যর্থতার এক নির্মম ও অনস্বীকার্য দলিল। একজন নাগরিক যখন প্রকাশ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানায়, হুমকির মুখে থাকার ইঙ্গিত দেয়, তারপরও যদি তিনি রাষ্ট্রের চোখের সামনেই নিহত হন তখন সেই রাষ্ট্র আর দায় এড়াতে পারে না। এই মৃত্যু রাষ্ট্রকে একটি সরল কিন্তু কঠিন প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে: যারা নাগরিককে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ, তারা কি আদৌ রাষ্ট্র পরিচালনার যোগ্য?
আজ প্রশ্ন আবেগের নয়, আজ প্রশ্ন জবাবদিহির। যে সরকার নাগরিকের জীবন রক্ষা করতে পারে না, সে সরকার ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার হারায় এটাই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মৌলিক নীতি। ইউনুস সরকারের অধীনে পুলিশ কমিশনার, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা ও জননিরাপত্তা সচিব এই তিনটি পদ সরাসরি নাগরিক নিরাপত্তার সঙ্গে যুক্ত। ওসমান হাদীকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হওয়ার পরও যদি তারা পদ আঁকড়ে থাকেন, তবে সেটি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি চরম দায়িত্বহীনতার প্রকাশ।
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ব্যর্থতার পর পদত্যাগ দুর্বলতার লক্ষণ নয়, বরং দায়িত্বশীলতার প্রমাণ। কিন্তু বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত। একজন নাগরিক খুন হয়েছেন, অথচ দায়িত্বশীলদের মধ্যে অনুশোচনা বা আত্মসমালোচনা নয় দেখা যাচ্ছে আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রতিযোগিতা। জনগণ স্পষ্ট করে বলছে তদন্তের অজুহাতে সময় ক্ষেপণ আর গ্রহণযোগ্য নয়। ব্যর্থতার দায়ে পদত্যাগই ন্যূনতম নৈতিক কর্তব্য।
এই ব্যর্থতা শুধু প্রশাসনের দৃশ্যমান অংশে সীমাবদ্ধ নয়। হত্যাকাণ্ডের পর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও খুনিরা ধরা না পড়া গোয়েন্দা ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থাকে ভেঙে দিয়েছে। ডিজিএফআই, এনএসআই, এসবি, ডিবি, বিজিবি এত সংস্থা, এত ক্ষমতা ও বিপুল বাজেট থাকা সত্ত্বেও যদি অপরাধীরা অধরা থাকে, তাহলে স্পষ্ট হয় সমস্যাটি ব্যক্তিগত নয়, সমস্যাটি নেতৃত্বে। তাই জনগণের দাবি পরিষ্কার গোয়েন্দা ব্যর্থতার দায়ে সংশ্লিষ্ট সংস্থার শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃত্বকে অবিলম্বে অপসারণ করতে হবে।
দায় কখনোই শুধু মাঠপর্যায়ে ঠেলে দেওয়া যায় না। রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব যদি নিরাপত্তা কাঠামো কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই ব্যর্থতার দায় সর্বোচ্চ পর্যায়েই গিয়ে থামে। প্রধান উপদেষ্টা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার সর্বোচ্চ দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের সামনে আজ আর কোনো নৈতিক পালানোর পথ নেই। জনগণের ভাষায় পদত্যাগ করুন, জবাবদিহির পথ খুলে দিন।
এই দাবি কোনো প্রতিশোধের দাবি নয়। এটি বিশৃঙ্খলার ডাক নয়। এটি রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার আহ্বানও নয়। বরং এটি রাষ্ট্রকে বাঁচানোর শেষ চেষ্টা। কারণ যে রাষ্ট্র ব্যর্থতাকে পুরস্কৃত করে, যে রাষ্ট্র দায় না নিয়ে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকে সে রাষ্ট্র ভবিষ্যতে আরও মৃত্যুর জন্য পথ তৈরি করে।
আজ ছাত্রসমাজ ও সচেতন নাগরিকরা যে প্রশ্ন তুলছে, তা খুব সহজ কিন্তু গভীর রাষ্ট্র পরিচালনা মানে কি কেবল ক্ষমতায় থাকা, নাকি দায় নেওয়া? জনগণের বিশ্বাস রাষ্ট্র পরিচালনা মানে ব্যর্থ হলে সরে দাঁড়ানো। শরীফ ওসমান হাদীর রক্ত সেই সত্যটিই আবার নির্মমভাবে সামনে এনে দিয়েছে।
জনগণের বার্তা এখন দ্ব্যর্থহীন ও আপসহীন—শরীফ ওসমান হাদীর মৃত্যু দায়ে রাষ্ট্রপরিচালনায় অযোগ্যদের পদত্যাগই একমাত্র ন্যায্যতা।
এর কোনো বিকল্প নেই।
এটাই ন্যায়বিচারের প্রথম ধাপ, এটাই রাষ্ট্রের প্রতি শেষ দায়।