সংবিধান বনাম ক্ষমতার লোভ, সেনাবাহিনীর ভূমিকা কোথায় দাড়াবে,সবার দৃষ্টি সেনাপ্রধানের দিকে

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক :: দক্ষিণ এশিয়ায় সেনাবাহিনী শুধুই প্রতিরক্ষা বাহিনী নয়; এটি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক স্থিতি এবং ক্ষমতার ভারসাম্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। পাকিস্তান, মিয়ানমার ও শ্রীলঙ্কার অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, সামরিক বাহিনী যদি রাজনৈতিক ক্ষমতায় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে হস্তক্ষেপ করে, তাহলে গণতন্ত্র দুর্বল হয়, জনগণের আস্থা ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা ভেঙে পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও সরকারের সম্পর্ক এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।

সম্প্রতি রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং সরকারের কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অবৈধ বা অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতায় থাকা কোনো সরকারের প্রতি সেনাবাহিনীর নীরব সহায়তা বা অব্যাহত সমর্থন দেশের সংবিধান এবং গণতন্ত্রের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার অভিজ্ঞতা সতর্কতার সংকেত দেয়। পাকিস্তান ও মিয়ানমারের উদাহরণ দেখায়, যখন সেনাবাহিনী রাজনৈতিক প্রভাবের হাতিয়ার হয়ে ক্ষমতা দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখার চেষ্টা করে, তখন রাষ্ট্রীয় কাঠামো ভেঙে পড়ে এবং সাধারণ জনগণ রাষ্ট্রযন্ত্র থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশে সেনাবাহিনী ঐতিহাসিকভাবে পেশাদার, শৃঙ্খলাবদ্ধ এবং সংবিধানসম্মত প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত। স্বাধীনতা যুদ্ধ, জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং শান্তি রক্ষা—সবক্ষেত্রেই সেনাবাহিনী দেশের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক চাপ এবং আঞ্চলিক কূটনীতির প্রভাবের কারণে সেনাবাহিনীর ভূমিকা নিয়ে জনগণের মধ্যে প্রশ্ন জন্মেছে। নাগরিকরা জানতে চায়, সেনাবাহিনী কতটা স্বাধীনভাবে সংবিধান এবং নির্বাচিত সরকারের প্রতি দায়বদ্ধ রয়েছে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কতটা নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে।

গণতন্ত্র টিকে থাকে তখনই, যখন নাগরিক নেতৃত্ব ও সামরিক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা থাকে। সেনাবাহিনী যদি রাজনৈতিক শক্তির হাতিয়ার হয়ে ওঠে, বিশেষত অবৈধ বা অসাংবিধানিকভাবে ক্ষমতায় থাকা সরকারের সহায়ক হিসেবে, তাহলে রাষ্ট্র দুর্বল হয় এবং জনমনে অবিশ্বাস তৈরি হয়। অন্যদিকে, সেনাবাহিনী যদি জনগণের নিরাপত্তা এবং সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থাকে, তবে সেটিই জাতীয় শক্তি হিসেবে রাষ্ট্রকে সমর্থন করে। বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই ভারসাম্য রক্ষা করা। সেনাবাহিনীকে সংবিধান এবং দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে; কোনো রাজনৈতিক বা বৈদেশিক চাপের কাছে দমনশীল হয়ে তা প্রভাবিত হলে দেশের ভবিষ্যৎ ঝুঁকির মুখে পড়বে।

জনমনে উদ্বেগ রয়েছে যে, যদি সেনাবাহিনী রাজনৈতিক চাপের কাছে অনুগত হয় বা অবৈধ সরকারের সহায়তায় যুক্ত হয়, তাহলে সংবিধান ও গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতা বিপন্ন হতে পারে। সাধারণ নাগরিকরা সচেতন—সেনাবাহিনী সবসময় দেশের স্বার্থে কাজ করবে, কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাবের কাছে দমনশীল হবে না। স্বচ্ছতা, পেশাদারিত্ব এবং সংবিধানবদ্ধতা নিশ্চিত করাই এখন প্রধান দাবি।

আজকের বিশ্বে সেনাবাহিনী কেবল যুদ্ধের জন্য নয়; এটি শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং রাষ্ট্রীয় ভারসাম্যের প্রতীক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হলো—সেনাবাহিনী কি স্বাধীন, পেশাদার এবং জনআস্থাভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে থাকবে, নাকি রাজনৈতিক ও বৈদেশিক চাপের প্রভাবে দেশের গণতন্ত্র ও সংবিধানকে দুর্বল করার চ্যালেঞ্জে পড়বে? গণতন্ত্রের নিরাপত্তা যেমন রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর নির্ভর করে, তেমনি রাষ্ট্রের মর্যাদা নির্ভর করে সেনাবাহিনীর পেশাদারিত্ব এবং সংবিধানবদ্ধতার ওপর।

অবৈধভাবে ক্ষমতায় থাকা সরকারকে দীর্ঘমেয়াদে সমর্থন প্রদান করে বা নীরব সহায়তা করে সেনাবাহিনী যদি রাজনৈতিক ভারসাম্যকে ক্ষুণ্ণ করে, তবে দেশের জন্য তা দীর্ঘমেয়াদি সংকটের দিক নির্দেশ করে। সুতরাং, সেনাপ্রধানের ভূমিকা আজকের প্রেক্ষাপটে সমালোচনামূলক এবং সর্বজনীন দৃষ্টি আকর্ষণ করছে—কোথায় দাঁড়াবে সেনাবাহিনী: সংবিধানের প্রতি দায়বদ্ধ থাকবেন নাকি ক্ষমতার লোভের ছায়ায় দেশের গণতন্ত্র দুর্বল হবে?

এই ভারসাম্য রক্ষা করা দেশের দীর্ঘমেয়াদি শান্তি, স্থিতিশীলতা এবং উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।