নিউজ ডেস্ক ::বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই এক কালো অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। সেদিন যারা নিজেদের “জুলাই যোদ্ধা” বলে দাবি করে অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করেছিল, তারা শুধু একটি বৈধ সরকারকেই উৎখাত করেনি, বরং সমগ্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে হত্যার পথে ঠেলে দিয়েছে। জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতৃত্বকে অপসারণ করে শুরু হয়েছে এক অনিশ্চয়তার যুগ, যেখানে রাষ্ট্র এখন জনগণের সেবক নয়, বরং দমনযন্ত্রে পরিণত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, গণতন্ত্র তখনই গভীর সংকটে পড়ে, যখন ভাষা বেআইনি হয়ে যায়। বাংলাদেশ আজ সেই বাস্তবতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে চলছে একের পর এক দমন অভিযান। এটি কেবল সেন্সরশিপ নয়, বরং একটি ভিন্নমতহীন রাষ্ট্র নির্মাণের ষড়যন্ত্র। ভিন্নমত, সমালোচনা এবং জনগণের প্রশ্নকে পদ্ধতিগতভাবে মুছে ফেলার প্রয়াস গণতন্ত্রকে মৃত্যুশয্যায় ঠেলে দিয়েছে।
*গণমাধ্যমের ওপর দমননীতি*
অবৈধ সরকারের প্রথম টার্গেট হয়েছে গণমাধ্যম। শত শত সাংবাদিকের প্রেস অ্যাক্রেডিটেশন বাতিল করে তাদের মাঠে কাজের সুযোগ কেড়ে নেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম অফিসে হামলা, যন্ত্রপাতি ভাঙচুর, সম্পাদক ও সংবাদপ্রধানদের জোর করে অপসারণ সবই একই পরিকল্পনার অংশ। মূল উদ্দেশ্য হলো সত্যকে স্তব্ধ করা, যাতে জনগণের সামনে কেবল সরকার-নির্ধারিত বয়ানই পৌঁছে যায়।
একই সঙ্গে তথ্য অধিকার আইনের সংস্কারে সরকারের উদাসীনতা জনগণের জানার অধিকারকে পুরোপুরি ক্ষুণ্ণ করছে। গণতন্ত্রের ভিত্তি হলো জনগণের জানার অধিকার, কিন্তু যখন সংবাদমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে রাখা হয়, তখন সেই ভিত্তি ধ্বংস হয়।
*নীরবতার রাষ্ট্রে পরিণত বাংলাদেশ*
আজকের বাংলাদেশ দ্রুত এমন এক রাষ্ট্রে রূপ নিচ্ছে, যেখানে নীরবতা আরোপিত। ভিন্নমত প্রকাশ মানে শাস্তির ঝুঁকি নেওয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ যে কেউ সমালোচনা করলেই হয়রানি, গ্রেপ্তার বা ভয়ভীতির শিকার হচ্ছে। ফলে মানুষ নিজেরাই আত্মনিয়ন্ত্রণের পথে হাঁটছে। তারা সত্য জানলেও মুখ খুলছে না। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা সমাজকে অন্ধকারের গভীরে ঠেলে দেবে।
*জনগণের উপর প্রভাব*
গণতন্ত্র কেবল ভোটের বিষয় নয় এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, জানার অধিকার এবং সরকারের জবাবদিহিতার সমষ্টি। কিন্তু আজ এই ভিত্তিগুলো ভেঙে পড়ছে। সাধারণ মানুষ দেখতে পাচ্ছে রাষ্ট্র আর তাদের প্রতিনিধি নয়, বরং ভয়ের প্রতীক। জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, রাজনৈতিক হতাশা বাড়ছে, যা সামাজিক অস্থিরতা ও বিভাজনের জন্ম দিতে পারে।
*ইতিহাসের শিক্ষা*
বাংলাদেশের মুক্তির ইতিহাস শেখায় যারা ভাষাকে বন্দি করে, তারা শেষ পর্যন্ত জাতিকেও বন্দি করে। পাকিস্তান আমলে সাংবাদিকদের কণ্ঠস্বর রোধ করা হয়েছিল, যার পরিণতিতে বাঙালি জাতি স্বাধীনতার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। আজ আবারও যদি সত্য বলা বেআইনি হয়, তবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে নতুন করে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। ইতিহাস কখনোই নীরব থাকে না, নীরবতা ভাঙার শক্তি জনগণের ভেতর থেকেই আসে।
বাংলাদেশের গণতন্ত্র আজ এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। সাংবাদিকদের কণ্ঠরোধ কেবল একটি পেশাজীবী মহলের সমস্যা নয় এটি সমগ্র জাতির অস্তিত্বের সংকট। সাংবাদিকতা হলো গণতন্ত্রের চোখ ও কান। এই চোখ অন্ধ হয়ে গেলে এবং এই কান বধির হয়ে গেলে, রাষ্ট্র অন্ধকারেই ঠেকে যাবে।