নিউজ ডেস্ক :: চট্টগ্রাম একসময় যে শহরটি শান্তি ও বাণিজ্যের জন্য পরিচিত ছিল, সেখানে এখন তীব্র উদ্বেগ ও আতঙ্কের পরিবেশ বিরাজ করছে। সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কমিশনার হাসিব আজিজের দেওয়া কথিত ‘শুট-টু-কিল’ বা দেখামাত্র গুলি চালানোর নির্দেশ শহরজুড়ে নতুন করে ভয় ছড়িয়েছে। পুলিশের ওয়্যারলেসে প্রচারিত এই মৌখিক নির্দেশ, যা সশস্ত্র অপরাধীদের লক্ষ্য করে দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে, তা মানবাধিকার ও আইনের শাসনের দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুতর বিতর্ক তৈরি করেছে।
১১ নভেম্বর দুপুরে বিভিন্ন থানা ও টহল দলকে কমিশনারের পক্ষ থেকে জানানো হয় যে, প্রচলিত শটগান ও চাইনিজ রাইফেল প্রত্যাহার করে সব টহল ইউনিটকে সাবমেশিনগান প্রদান করা হবে। আরও বলা হয়—সশস্ত্র অপরাধী দেখা গেলে সঙ্গে সঙ্গে গুলি চালানো হবে এবং এ জন্য দায়দায়িত্ব কমিশনার নিজেই বহন করবেন। এমন নির্দেশ পুলিশের মনোবল বাড়ালেও সাধারণ মানুষের মনে তৈরি করেছে উল্টো প্রতিক্রিয়া—ভয়, উদ্বেগ এবং নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি।
চট্টগ্রামের মানুষ প্রতিদিন সন্তানকে স্কুলে পাঠান, কর্মস্থলে যান, বাজারে যান—এবং তারা আশা করেন পুলিশ তাদের সুরক্ষার প্রতীক হবে। কিন্তু একই বাহিনীর কাছ থেকে যখন দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ আসে, তখন সেই সুরক্ষা-প্রতীকই জনগণের কাছে আতঙ্কের প্রতীক হয়ে ওঠে। ৫ নভেম্বর বায়েজিদ বোস্তামী থানার অন্তর্গত খোন্দকারাবাদ এলাকায় রাজনৈতিক কর্মসূচির সময় এক ব্যক্তির মৃত্যুর ঘটনার পরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এই কঠোর অবস্থান সামনে আসে।
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের মতে, এমন নির্দেশনা শুধু আইনি প্রক্রিয়া লঙ্ঘনই নয়, বরং ‘বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের’ ঝুঁকি বাড়ায়। অপরাধী শনাক্ত করার যথাযথ প্রক্রিয়া ছাড়া যদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গুলি চালায়, তাহলে সাধারণ নাগরিকও অনিচ্ছাকৃতভাবে টার্গেট হতে পারেন। মানব জীবনের মূল্যায়ন কমে যায়, বিচারব্যবস্থার ওপর আস্থা নষ্ট হয়, আর রাষ্ট্রের দায়িত্ববোধ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এই প্রেক্ষাপটে কানাডাভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন Global Alliance Against Atrocity and Violence on Humanity (GA3VH) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটি মনে করে—যে কোনো দেশের নিরাপত্তা-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তই মানবাধিকারের সীমা অতিক্রম করতে পারে না। ‘শুট-টু-কিল’ ধাঁচের নির্দেশ সাধারণত যুদ্ধক্ষেত্র বা সন্ত্রাসবিরোধী বিশেষ অভিযানে ব্যবহৃত হয়, কিন্তু জনবহুল নগর পরিবেশে এর প্রয়োগ অতি বিপজ্জনক। GA3VH সতর্ক করে বলেছে, এমন নির্দেশ যদি কার্যকর থাকে, তবে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সনদের চরম লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
চট্টগ্রামের বর্তমান পরিস্থিতি তাই একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কি মানবাধিকারের পরিপন্থী পথে গিয়ে সম্ভব? নাকি নিরাপত্তা ও মানবাধিকার—উভয়ের সমন্বয়ই একটি সত্যিকারের স্থিতিশীল সমাজ গড়তে পারে? রাষ্ট্র, সরকার ও নাগরিক সমাজকে এই মুহূর্তে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে—কারণ কোনো রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষই নাগরিকের জীবন-মর্যাদার চেয়ে বড় নয়।
যে শহরে মানুষ হাঁটতে ভয় পায়, যেখানে পুলিশের গুলি যে কাউকে লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আঘাত করতে পারে—সেখানে নিরাপত্তা নয়, বিশৃঙ্খলই বৃদ্ধি পায়। তাই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার যে কোনো উদ্যোগ অবশ্যই কঠোর নজরদারি, স্বচ্ছতা এবং মানবাধিকার সম্মত পদ্ধতির আওতায় হওয়া উচিত।
GA3VH-এর উদ্বেগ তাই কেবল একটি আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন নয়; এটি চট্টগ্রামের মানুষের ভয়ের প্রতিফলন এবং মানবাধিকারের প্রতি বিশ্ব সম্প্রদায়ের গুরুত্বের একটি দৃশ্যমান স্মারক। নিরাপত্তা নিশ্চিতে কঠোরতা দরকার হতে পারে, কিন্তু কোনোভাবেই তা নাগরিকের জীবনের মূল্যের ওপরে স্থান পেতে পারে না।