সিলেটের আস্ত টিলা গিলে খেয়ে পুকুর বানাল বিএনপি, প্রশাসনের নীরবতা

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৭ মাস আগে

ক্রাইম নিউজ সিলেট :: গ্রামের নাম চিকাডোহর। ইউনিয়ন ইসলামপুর। উপজেলা কোম্পানীগঞ্জ। ভোলাগঞ্জ বাজার থেকে সিলেট শহরে আসতে হাতের ডান দিকে সরু আঁকা-বাঁকা রাস্তা। সে রাস্তা ধরে এগোলেই শাহ আরেফিন (শার্ফিন) টিলা। বর্ষা মৌসুমে ভাঙাচোরা সড়কের কোথাও কোথাও হাঁটুপানি। কষ্টেসৃষ্টে গন্তব্যে যেতে মোটরসাইকেলই একমাত্র ভরসা।

লাল মাটি আর লাল পাথরের টিলা। সৌন্দর্য ছিল মোহনীয়। টিলায় উঠে পাশের দেশ ভারতের মেঘালয়ের সৌন্দর্য উপভোগ করতেন পর্যটকরা। এটা বছরখানেক আগের কথা। এখন দেখে বোঝারই উপায় নেই যে এটি টিলা ছিল। গত বছরের ৫ আগস্টের পর সিলেটে একযোগে শুরু হওয়া পাথর লুটের বলি এ টিলাটিও।

শার্ফিন টিলার লাল মাটি এখন ধূসর। পাথরের চিহ্ন নেই। টিলাও নিশ্চিহ্ন। টিলার মাটি-পাথর সবই পাথরখেকোদের পেটে! প্রাকৃতিক টিলা এখন মনুষ্যসৃষ্ট পুকুর! বৃষ্টির পানি জমে এমন অবস্থা দাঁড়িয়েছে যে আগে এখানে টিলা ছিল কেউ বিশ্বাসই করবে না। যারা প্রথমবার যাবে তারা জানবেও না যে তারা যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেখানে ছিল কোনো মাটি কিংবা পাথুরে টিলা।

গ্রামবাসীর মনে এখন অজানা আতঙ্ক। অপরিচিত লোক দেখলেই বিরক্তির ছাপ। এদিক-ওদিক আর মানুষের মুখের দিকে তাকাতে থাকে। একজন আরেকজনের সঙ্গে কানাকানি করে, ‘প্রশাসন অথবা মিডিয়ার লোক’। কথা বলতে চায় না স্থানীয়দের কেউই। সাংবাদিক পরিচয় গোপন করে পর্যটক হিসেবে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলেও একজন আরেকজনকে ইশারায় সতর্ক করে।

স্থানীয় সূত্র আর দিনপত্র নিউজের অনুসন্ধানে জানা যায়, গত বছরের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর স্থানীয় কিছু পাথর ব্যবসায়ী সিলেট মহানগর,ও জেলা বিএনপির প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দকে নিয়ে পুরোদমে এই টিলার খনন শুরু করে। হাজার হাজর ট্রাক পাথর সরিয়ে নেয়। টিলার পাথর লাল হওয়ায় বাজারে এর চাহিদাও বেশি। মূলত টিলা কেটে পাথর সংগ্রহ করে সেগুলো পাঠানো হতো পার্শ্ববর্তী ক্রাশার মেশিনে। সেখানে পাথর ভেঙে পরে বিক্রি করে দেওয়া হতো। এভাবে এক বছরে আস্ত একটি টিলা খনন করে ছোট-বড় পুকুর বানিয়ে ফেলা হয়েছে।

সিলেট শহর থেকে ভোলাগঞ্জের পথে শত শত ক্রাশার মেশিন। এসব মেশিনেই পাথর ভাঙা হয়। প্রশাসনের অভিযানের পর এসব মেশিন ফেলে পালিয়েছেন মালিকরা। বর্তমানে মেশিন ও পাথর পড়ে থাকতে দেখা যায়। এর অধিকাংশই ভোলাগঞ্জের সাদা পাথর। তবে বেশ কিছু পাথর ভাঙা মেশিনের পাশে শার্ফিন টিলার লাল পাথরের স্তূপ দেখা গেছে।

টিলার পাথর লুটের সঙ্গে স্থানীয়ভাবে জালিয়ার পাড় ও চিকাডোহর গ্রামের কিছু লোকজন জড়িত বলে জানা যায়। এদের অধিকাংশই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিএনপির রাজনীতিতে যুক্ত। প্রশাসনের ছত্রছায়ায় লুট করা পাথর সরিয়ে নেওয়া হয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। কমিশন খেয়ে দেখেও না দেখার ভান করেছে পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসন। এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।।

পরিবেশ অধিদপ্তরের আমরা সরাসরি কোর্টে মামলা করেছিলাম। এটার আলাদা চার্জশিট দেওয়া লাগে না, মামলায়ই বিচার হয়। ওখানে যে গ্রাম আছে সেখানকার অধিকাংশই এ কাজে জড়িত। আমরা শ্রমিকদের আসামি করিনি, যারা প্রভাব খাটিয়ে এ কাজ করেছে তাদের আসামি করেছি।- পরিবেশ অধিদপ্তর সিলেট জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. বদরুল হুদা,

পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে জানতে সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) উজায়ের আল মাহমুদ আদনানের অফিসিয়াল এবং ব্যক্তিগত নম্বরে একাধিকবার কল দিলে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়। এছাড়া সিলেট জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) মো. সম্রাট তালুকদার এবং সিলেট জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানকে একাধিকবার ফোন দিলেও তারা রিসিভ করেননি।

শাহ আরেফিন টিলা কেটে বিক্রি চক্রের অন্যতম হোতা কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার সাবেক চেয়ারম্যান শামীম আহমেদ। স্থানীয় ও মামলা সূত্রে জানা যায়, উপজেলার জালিয়ার পাড় গ্রামের মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, মনির আলী, ইয়াকুব আলী, বাবুল চেয়ারম্যান, ইসমাইল, করিম, আলী হোসেন, তৈয়ব আলী, বতুল্লাহ মিয়া, আব্দুল রশিদ, আলী হোসেন ও তাদের চক্র দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে পাথর উত্তোলন করে বিক্রি করে আসছে। স্থানীয়ভাবে এদের সবাই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত এদের শেল্টার দিচ্ছেন সিলেট জেলা ও মহানগর বিএনপির প্রভাবশালী দুই নেতা।।