সেনা সদস্যদের বেআইনি আটক,আইনের শাসন প্রশ্নের মুখে

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক :: আইনের শাসন কোনো রাষ্ট্রের সভ্যতা ও গণতন্ত্রের ভিত্তি। কিন্তু যখন সেই আইনই বেছে বেছে প্রয়োগ করা হয়, তখন রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে পড়ে। সাম্প্রতিক আইসিটি মামলায় আটককৃত সেনা সদস্যদের ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির না করা—একটি গুরুতর আইনি ও সাংবিধানিক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৩ অনুচ্ছেদ ও ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ধারায় বলা আছে, কোনো ব্যক্তিকে আটক করলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করতেই হবে। এটি শুধু আইন নয়, এটি নাগরিকের মৌলিক অধিকারও। অথচ আইসিটি মামলার অভিযোগে আটক সেনা সদস্যদের কয়েক দিন পেরিয়ে গেলেও আদালতে তোলা হয়নি। এটি স্পষ্টতই আইন লঙ্ঘন এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থার ওপর এক গভীর আঘাত।

প্রশ্ন হচ্ছে—কেন এমনটি ঘটছে? যদি সেনা সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রকৃত অপরাধের অভিযোগ থাকে, তবে স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করলেই তো রাষ্ট্রের অবস্থান আরও দৃঢ় হতো। কিন্তু আদালতের সামনে হাজির না করে আটক রাখা মানেই আইনের চেয়ে প্রশাসনিক ইচ্ছাকে অগ্রাধিকার দেওয়া। এটি শুধু আটক ব্যক্তিদের অধিকারের লঙ্ঘন নয়, বরং রাষ্ট্রের আইন ও বিচারব্যবস্থার মর্যাদারও অবমাননা।

বাংলাদেশ সেনাবাহিনী দেশের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রতীক। তাদের সদস্যদের বেআইনিভাবে আটক রাখার ঘটনা বাহিনীর মর্যাদাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এ ধরনের ঘটনা বাহিনীর মনোবল ক্ষুণ্ণ করতে পারে এবং প্রশাসনের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক দুর্বল করতে পারে। রাষ্ট্রের কোনো প্রতিষ্ঠানই আইনের ঊর্ধ্বে নয়, কিন্তু কেউ আইনের নিচেও নয়—এই নীতি রক্ষা করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব।

বিচারব্যবস্থার ক্ষেত্রে “আইনের শাসন” মানে হলো—সব নাগরিক আইনের চোখে সমান। কিন্তু যদি দেখা যায়, আইন দ্রুত কার্যকর হচ্ছে কারও জন্য, আর কারও জন্য তা স্থগিত থাকছে—তাহলে সেটি আইনের শাসন নয়, বরং বেছে নেওয়া ন্যায়বিচার। এই বেছে নেওয়া ন্যায়বিচারই সমাজে অবিশ্বাস ও প্রতিহিংসার সংস্কৃতি তৈরি করে, যার পরিণতি হয় রাষ্ট্রীয় অনিশ্চয়তা।

একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের জন্য বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা অপরিহার্য। এই আস্থা তখনই গড়ে ওঠে, যখন আইনি প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও সংবিধাননির্ভর হয়। সেনা সদস্যদের আদালতে হাজির না করা কেবল আইনি নয়, নৈতিক বিচ্যুতিও বটে। এটি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে একটি ভুল বার্তা দেয়—যে ক্ষমতা চাইলে আইনকে পাশ কাটিয়ে যেতে পারে।

রাষ্ট্রের উচিত দ্রুত এই ভুল সংশোধন করা। আটক সেনা সদস্যদের আইনি প্রক্রিয়ায় আদালতে হাজির করতে হবে এবং তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তা প্রমাণের সুযোগ দিতে হবে। কারণ আইন যদি ক্ষমতার ছায়ায় বন্দী হয়, তবে ন্যায়বিচার কেবল মুখের বুলি হয়ে থাকবে।

বাংলাদেশের জনগণ চায়—ন্যায়বিচার বাস্তবে ফিরে আসুক, সংবিধানের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ থাকুক, আর আইন হোক সকলের জন্য সমান। কেবল তাহলেই “আইনের শাসন” কথাটি অর্থপূর্ণ হবে—নয়তো তা কেবল কাগজে-কলমেই থেকে যাবে।