স্বাধীনতার মাসে অবৈধ সংসদে যুদ্ধাপরাধী বন্দনা: ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায় ও চরম জাতীয় বেইমানি

লেখক: আকিব হোসেন জাবির
প্রকাশ: ১ মাস আগে

দিনপত্র ডেস্ক ::  বাঙালি জাতির অহংকারের মাস মার্চে বাংলাদেশের তথাকথিত জাতীয় সংসদ গতকাল যে নজিরবিহীন ও নির্লজ্জ ঘটনার সাক্ষী হলো তা এ দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসের সবথেকে অন্ধকারতম অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে দেশের সর্বোচ্চ আদালত কর্তৃক দণ্ডিত শীর্ষ যুদ্ধাপরাধীদের নাম সংসদের শোক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত করে বিএনপি এবং জামায়াতে ইসলামী যে রাজনৈতিক ধৃষ্টতা দেখিয়েছে তা কেবল ৩০ লক্ষ শহীদের আত্মার অবমাননা নয় বরং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের মূলে এক বিষাক্ত কুঠারাঘাত। একটি সাজানো ও প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত এই অবৈধ সংসদের স্পিকার মেজর অব হাফিজ উদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত প্রথম অধিবেশনে যেভাবে একে একে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত চিহ্নিত আসামিদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো হয়েছে তা এ দেশের মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে তীব্র রক্তক্ষরণ ঘটিয়েছে। এই শোক প্রস্তাব ও অধিবেশনের কার্যক্রম সরাসরি প্রমাণ করে যে বর্তমান সংসদ কোনোভাবেই জনগণের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন নয় বরং এটি ডক্টর ইউনুসের সাজানো একতরফা ও পাতানো নির্বাচনের মাধ্যমে তাঁর অনুগত সহযোগীদের অবৈধভাবে ক্ষমতায় বসানোর একটি আজ্ঞাবহ মঞ্চ মাত্র। এই সংসদে আসীন কথিত সংসদ নেতা থেকে শুরু করে অবৈধ বিরোধী দলীয় নেতা ও স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকার প্রত্যেকেই এই জাতীয় বেইমানির অংশীদার হিসেবে ইতিহাসের কাঠগড়ায় অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবেন।
অধিবেশনের শুরুতেই সংসদীয় প্রথা ও ন্যূনতম নৈতিকতাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চতুরতার সাথে শোক প্রস্তাবে মতিউর রহমান নিজামী এবং আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী এবং আবদুল কাদের মোল্লা ও দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর মতো কুখ্যাত ব্যক্তিদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অথচ এই প্রতিটি ব্যক্তি ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর প্রত্যক্ষ সহযোগী হিসেবে গণহত্যা ও লুণ্ঠন এবং নারী নির্যাতনের মতো নৃশংস অপরাধে লিপ্ত ছিলেন এবং দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও উচ্চ আদালতে তাঁদের অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছিল। অবৈধ চিফ হুইপ এবং সাজানো নির্বাচনের বিরোধী দলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের পক্ষ থেকে আসা এই প্রস্তাবগুলো যখন সংসদে গৃহীত হচ্ছিল তখন মনে হচ্ছিল ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে কেনা এই মাটি যেন আবারও একাত্তরের সেই ঘাতক দালালদের কবলে নিপতিত হয়েছে। এই অবৈধ সংসদের প্রথম অধিবেশনেই বিএনপির আসল চরিত্র এবং তাদের মেকি দেশপ্রেমের কুৎসিত মুখোশ আবারও উন্মোচিত হয়েছে। বিএনপি মুখে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বললেও বাস্তবে তারা কখনোই মুক্তিযুদ্ধকে ধারণ করে না বরং এটি নিয়ে এক ভয়াবহ ভণ্ডামি ও রাজনৈতিক ব্যবসা করে আসছে। তাদের অন্তরে মূলত আজীবন লালিত জামাতপ্রেম এবং তারা যে আপাদমস্তক জামাতের সহযোগী ও দোসর তা আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে গেছে। সংসদের শুরুতেই তারা জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক হিসেবে প্রচার করে যে নির্জলা মিথ্যাচার শুরু করেছে তা ইতিহাসের প্রতি এক চরম বিশ্বাসঘাতকতা। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে ১৯৭১ সালের ২৬শে মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই স্বাধীনতার আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়েছিলেন। এই ধ্রুব সত্যকে অস্বীকার করে যারা ইতিহাস বিকৃতির ওপর দাঁড়িয়ে অবৈধ সংসদের যাত্রা শুরু করে তারা যে বাংলাদেশের অস্তিত্বে বিশ্বাস করে না তা আজ জাতির সামনে প্রমাণিত। বিএনপি প্রকৃতপক্ষে জামাতের এজেন্ডা বাস্তবায়নকারী একটি রাজনৈতিক ফ্রন্ট যারা বাংলাদেশে রাজাকারি আদর্শকে পুনরায় রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশের প্রতি তাদের চিরন্তন ঘৃণা ও অবজ্ঞা আবারও প্রকাশ্যে প্রদর্শন করেছে। জামাত যে এ দেশের মুক্তিযুদ্ধ ও সংবিধান এবং জাতীয় পতাকাকে বিন্দুমাত্র সম্মান করে না তার প্রমাণ মিলেছে অবৈধ সংসদের ভেতরে জাতীয় সংগীত চলার সময় তাদের ঔদ্ধত্যপূর্ণ ও ধৃষ্টতাপূর্ণ আচরণে। জাতীয় সংগীত বাজানোর সময় জামাত সদস্যদের সিটে বসে থাকা এবং পরবর্তীতে অনিচ্ছাসত্ত্বেও অন্যদের চাপে দাঁড়িয়ে পড়ার ভান করা প্রমাণ করে যে দীর্ঘ ৫৪ বছর পরেও তারা এই স্বাধীন রাষ্ট্রকে মনেপ্রাণে গ্রহণ করতে পারেনি। সংবিধানের ৪ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং জাতীয় সংগীত বিধিমালার তোয়াক্কা না করা এই উগ্রবাদী গোষ্ঠী মূলত একটি রাষ্ট্রবিরোধী শক্তি। যে দল মুক্তিযুদ্ধের প্রকাশ্য বিরোধিতা করেছে এবং যারা আজও জাতীয় সংগীতকে সম্মান করতে চায় না সেই দলের সাথে হাত মিলিয়েই সাজানো একতরফা নির্বাচনের পরবর্তী এই সংসদে সমানতালে অংশ নিয়েছে বিএনপি। এটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রার পিঠে এক বিষাক্ত ছুরিকাঘাত ছাড়া আর কিছুই নয়।
বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট গভীর ও নিবিড়ভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে ২০২৪ সালের ৫ই আগস্টের পর থেকে দেশে যে তথাকথিত পরিবর্তনের নাটক মঞ্চস্থ হচ্ছে তা আসলে এক গভীর আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র বা কালার রেভল্যুশনের অংশ। অসাংবিধানিক ও অবৈধ উপায়ে ক্ষমতা দখলকারী ডক্টর ইউনুস প্রশাসন এবং তাঁর প্রত্যক্ষ মদদে বসানো বর্তমান আজ্ঞাবহ সংসদ পরিকল্পিতভাবে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিকে ধ্বংস করার নীলনকশা বাস্তবায়ন করছে। এর ফলে আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি এটিএম আজহারের মতো ব্যক্তিরা কারামুক্তি পেয়ে দম্ভভরে অবৈধ সংসদে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেন যে জুলাই আগস্টের পরিবর্তন না হলে তাদের মতো অপরাধীরা আজ এই আসনে বসার সুযোগ পেতেন না। এই অবৈধ ও আজ্ঞাবহ সংসদ মূলত বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য এক বিশাল অশনিসংকেত। গত ১৯ মাসের প্রতিটি ঘটনাপ্রবাহ প্রমাণ করেছে যে আওয়ামী লীগ ব্যতীত মহান মুক্তিযুদ্ধকে এ দেশে কেউ প্রকৃত অর্থে ধারণ করে না। বিএনপি এবং জামাত যে একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ তা আজ দেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে পরিষ্কার। ৫ই আগস্টের তথাকথিত বিপ্লব মূলত ঘটানোই হয়েছে জামাত শিবিরের নিখুঁত পরিকল্পনায় যার মূল লক্ষ্য ছিল বাংলাদেশবিরোধী অপশক্তি রাজাকার ও আল বদর এবং আল শামসদের পুনরুত্থান ঘটানো।
পরিশেষে এটি নিশ্চিত করে বলা যায় যে দেশি বিদেশি ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করা গেলেও এবং অবৈধ সংসদের মোড়কে খুনিদের বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও সত্যকে কখনো চিরতরে মুছে ফেলা যায় না। যে সংসদ দেশের জন্মের ইতিহাস বিকৃতির মাধ্যমে যাত্রা শুরু করে এবং যারা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের পবিত্র শোক প্রস্তাবে ঠাঁই দেয় সেই সংসদ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হতে বাধ্য হবে। বাংলাদেশের ললাটে গতকাল যে কলঙ্কের তিলক পরিয়ে দেওয়া হলো তার বিচার ইতিহাস এবং এ দেশের সচেতন জনগণ অবশ্যই করবে। এই অবৈধ ও আজ্ঞাবহ সরকার এবং তাদের সাজানো সংসদ অচিরেই দেশপ্রেমিক জনগণের তীব্র প্রতিরোধের মুখে ধূলিসাৎ হয়ে যাবে এটাই সময়ের অনিবার্য দাবি।