নিউজ ডেস্ক :: বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস এক অনন্য অধ্যায় রক্ত, আত্মত্যাগ ও বিশ্বাসের মহাকাব্য। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে আজও সেই ইতিহাসের শত্রুরা নানাভাবে সক্রিয় হয়ে উঠছে। মুক্তিযুদ্ধবিরোধী শক্তি ও পাকিস্তানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর ছায়া বারবার রাষ্ট্রের বিভিন্ন স্তরে অনুপ্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে।
সাম্প্রতিক সময়ে এমন একটি খবর আলোচনায় এসেছে যেখানে দাবি করা হচ্ছে, স্বাধীনতা-বিরোধী রাজাকার গোলাম আজমের পুত্র আজমী এবং পাকিস্তানের গোয়েন্দা ও সেনা প্রধান ওয়াকারুজ্জামান বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর ভেতরে মুক্তিযুদ্ধপন্থী কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে একটি ষড়যন্ত্রমূলক পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন।
অভিযোগ অনুযায়ী, এই চক্র সেনাবাহিনীর চাকরিরত মুক্তিযুদ্ধপন্থী অফিসারদের একটি তালিকা তৈরি করেছে—যেখানে রয়েছে ২৫ জন মেজর জেনারেল, ৬৫ জন ব্রিগেডিয়ার, ১২৬ জন কর্নেল এবং ২০০ জন লেফটেন্যান্ট কর্নেল ও মেজর। বলা হচ্ছে, এদের অনেকেই আওয়ামী লীগ পরিবারভুক্ত বা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান। পরিকল্পনা অনুযায়ী, এই অফিসারদের সেনা আইনের নানা অজুহাতে বাহিনী থেকে সরিয়ে দেওয়ার নকশা চলছে।
যদিও এই তথ্যের স্বাধীন যাচাই এখনো হয়নি, তবু এমন অভিযোগের গুরুত্ব কম নয়। কারণ সেনাবাহিনী কেবল একটি প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান নয়—এটি বাংলাদেশের স্বাধীনতার উত্তরাধিকার বহন করছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় গঠিত এই বাহিনীকে দুর্বল করার অর্থ হলো রাষ্ট্রের মেরুদণ্ডে আঘাত হানা।
*ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ও বিপদের ইঙ্গিত*
বাংলাদেশের ইতিহাসে ষড়যন্ত্র নতুন নয়। স্বাধীনতার পর থেকে রাজাকার-আলবদরদের পুনর্বাসন, সামরিক অভ্যুত্থান এবং ধর্মীয় রাজনীতির উত্থান—সবই মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ধারার ধারাবাহিকতা। গোলাম আজম, যিনি এক সময় মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিলেন, তার উত্তরসূরিরা আজও বাংলাদেশের প্রগতিশীল শক্তিকে ধ্বংস করার স্বপ্ন দেখে—এমন আশঙ্কা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
পাকিস্তানও বরাবরই চেয়েছে বাংলাদেশকে অভ্যন্তরীণভাবে দুর্বল করে দিতে। তারা ভালো করেই জানে—বাংলাদেশের শক্তি তার মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে। তাই যদি সেনাবাহিনীর ভেতর থেকেই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের কর্মকর্তাদের সরিয়ে দেওয়া যায়, তাহলে রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিই নড়বড়ে হয়ে যাবে।
*সেনাবাহিনীর ঐতিহ্য ও সতর্কতার প্রয়োজন*
বাংলাদেশ সেনাবাহিনী জাতির গর্ব। তাদের শৃঙ্খলা, আত্মত্যাগ ও পেশাদারিত্ব বিশ্বে প্রশংসিত। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে তাদের অবদান দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করেছে। এই বাহিনীর ভেতরে কোনো রাজনৈতিক বা মতাদর্শিক অনুপ্রবেশের আশঙ্কা মানেই জাতির নিরাপত্তার ঝুঁকি।
তাই রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো, সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী চক্রের কোনো প্রভাব পড়লে তা দ্রুত শনাক্ত ও প্রতিরোধ করা। এক্ষেত্রে গোয়েন্দা সংস্থা, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং উচ্চ সামরিক কর্তৃপক্ষকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।
*মুক্তিযুদ্ধপন্থী অফিসারদের সুরক্ষা রাষ্ট্রের দায়*
যাঁরা মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান, বা মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী—তাঁরা বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। তাঁদের যদি রাজনৈতিক কারণে লক্ষ্যবস্তু বানানো হয়, তবে তা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়; বরং রাষ্ট্রের মূল্যবোধের ওপর সরাসরি আঘাত।
সরকারকে অবশ্যই নিশ্চিত করতে হবে যে, কোনো অফিসার তাঁর পারিবারিক পরিচয় বা মতাদর্শের কারণে বৈষম্যের শিকার হবেন না। মুক্তিযুদ্ধপন্থী সেনাদের মনোবল ভাঙা মানে গোটা সেনাবাহিনীর চেতনা দুর্বল করা।
তথ্যের এই যুগে গুজব ও বাস্তবতার সীমারেখা প্রায়ই মিশে যায়। তাই যে কোনো অভিযোগকে যাচাই-বাছাই ছাড়া প্রচার করা যেমন বিপজ্জনক, তেমনি তা উপেক্ষাও করা যায় না। রাষ্ট্রকে দায়িত্বশীলভাবে তদন্ত করতে হবে, প্রমাণ পেলে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, আর মিথ্যা হলে গুজবকারীদের বিরুদ্ধেও কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে।
এটাই হবে পরিপক্ব রাষ্ট্রের পরিচয় যেখানে সত্য যাচাইয়ের আগে কোনো তথ্যকে সত্য বা মিথ্যা বলে চূড়ান্ত ঘোষণা দেওয়া হয় না।
বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও মর্যাদা টিকে আছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায়। সেই চেতনার বিরুদ্ধে যদি আবারও ষড়যন্ত্র শুরু হয়, তাহলে সেটা কেবল রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ নয় এটি হবে জাতির আত্মার বিরুদ্ধে যুদ্ধ।
স্বাধীনতা-বিরোধী যে কোনো শক্তি, দেশীয় বা বিদেশি, কখনোই বাংলাদেশের সেনাবাহিনী ও রাষ্ট্রকে বিভক্ত করতে পারবে না এই বিশ্বাসই হতে হবে প্রতিটি নাগরিকের শপথ। রাষ্ট্র, সেনাবাহিনী ও জনগণ যদি ঐক্যবদ্ধ থাকে, তাহলে কোনো ষড়যন্ত্রই সফল হবে না।
বাংলাদেশ স্বাধীন ছিল, স্বাধীন আছে এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বলেই চিরকাল স্বাধীন থাকবে।