স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ‘ব্রিটকেস সিন্ডিকেট’,পরিচালক প্রশাসন ডা: আবু হানিফের বিরুদ্ধে কোটি কোটি টাকা লোপাটের গুরুতর অভিযোগ

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক :: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রশাসনিক শাখাকে ঘিরে উঠে আসা সাম্প্রতিক অভিযোগগুলো দেশের স্বাস্থ্যখাতের স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রশাসনিক নৈতিকতা নিয়ে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নির্ভরযোগ্য সূত্রের অভিযোগ অনুযায়ী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) ডা. আবু হানিফের প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে কেনাকাটা, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি সেবার নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ লোপাট করে আসছে।

সূত্রগুলো বলছে, মাঠপর্যায়ে যাদের ‘ক্যাসিয়ার’ হিসেবে পরিচিত করা হয়, তারাই মূলত এই দুর্নীতির অর্থ সংগ্রহ ও ব্যবস্থাপনার কাজ করে। হাসপাতাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট, ক্রয়-বিক্রয় কার্যক্রম, বদলি, সংযুক্তি ও ওএসডির মতো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে হাতিয়ার করে কোটি কোটি টাকার অবৈধ লেনদেন পরিচালিত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্টদের শত কোটি টাকার মালিক হওয়া এবং বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগও সামনে এসেছে।

অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ডা. সোহেল, ডা. মোস্তাফিজুর রহমান, ডা. আফতাবসহ প্রায় ডজনখানেক নবীন মেডিকেল অফিসার পর্যায়ের কর্মকর্তা। সূত্র অনুযায়ী, এসব কর্মকর্তাকে হাসপাতাল সার্ভিস ম্যানেজমেন্ট শাখাসহ বিভিন্ন উইংয়ে বদলি, ওএসডি ও সংযুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে আনা হয়। তারা পরিচালক প্রশাসনের কক্ষের পাশের কক্ষগুলোতে বসে তদবীর কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এমনকি অভিযোগ রয়েছে—এই চক্রের অন্তত দুজন মেডিকেল অফিসারকে প্রায় সার্বক্ষণিকভাবেই পরিচালকের কক্ষে অবস্থান করতে দেখা যায়।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ভেতরে এই চক্রটি ‘ব্রিটকেস গ্রুপ’ বা ‘ব্রিটকেস সিন্ডিকেট’ নামে পরিচিত। কর্মঘণ্টা শেষে সন্ধ্যার পর একাধিক কর্মকর্তাকে ব্রিফকেস হাতে করে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়—যা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই অধিদপ্তরের ভেতরে ও বাইরে আলোচনা চলছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকা অবৈধ আয় করেন পরিচালক প্রশাসন ডা. আবু হানিফ।

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো—প্রায় ১০ কোটি টাকার একটি কন্ট্রাক্টের বিনিময়ে চাকরির মেয়াদ আরও ছয় মাস বাড়াতে এনসিপির উত্তর অঞ্চলের এক প্রভাবশালী নেতার সঙ্গে একটি অলিখিত সমঝোতা হয়েছে। যদিও এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক নথি বা বক্তব্য প্রকাশ্যে আসেনি, তবে প্রশাসনের ভেতরে বিষয়টি নিয়ে তীব্র আলোচনা রয়েছে বলে সূত্রের দাবি।

এই দুর্নীতির অভিযোগের পেছনে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার প্রসঙ্গও উঠে এসেছে। অভিযোগ অনুযায়ী, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ডা. আবু হানিফ ঢাকায় বদলি হন একজন সাবেক মন্ত্রী এবং ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় নেতার সুপারিশে। সমালোচকদের মতে, ওই রাজনৈতিক সুপারিশের মাধ্যমেই তার প্রশাসনিক উত্থান ঘটে এবং ধীরে ধীরে তিনি স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে প্রভাব বিস্তার করেন। তাদের ভাষায়, এই রাজনৈতিক আশ্রয়ই তাকে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্নের ঊর্ধ্বে থাকার সুযোগ করে দিয়েছে।

এছাড়া স্বাস্থ্যখাত ধ্বংসকারী এই শীর্ষ দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আবু হোসেন নামের এক ব্যক্তি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন বলেও জানা গেছে। অভিযোগে আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অবৈধ আয়ের বিষয়গুলো উল্লেখ করা হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। তবে একই সঙ্গে অভিযোগ উঠেছে—এই লিখিত অভিযোগটি তদন্তের পর্যায়ে যাওয়ার আগেই প্রভাব খাটিয়ে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অভিযোগ যদি সত্য হয়, তবে তা কেবল ব্যক্তিগত দুর্নীতির বিষয় নয়; বরং পুরো স্বাস্থ্য প্রশাসনের কাঠামোগত দুর্বলতা ও রাজনৈতিক প্রভাবের বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত। একটি দেশের স্বাস্থ্যখাত যখন এ ধরনের সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়, তখন তার সরাসরি ভুক্তভোগী হয় সাধারণ মানুষ—যারা চিকিৎসা, ওষুধ ও জরুরি সেবা থেকে বঞ্চিত হয়।

এই প্রেক্ষাপটে পরিচালক প্রশাসন ডা. আবু হানিফের ভূমিকা, তথাকথিত ‘ব্রিটকেস সিন্ডিকেট’-এর কার্যক্রম, রাজনৈতিক সুপারিশের বিষয় এবং দুদকে দাখিলকৃত অভিযোগ—সবকিছুই অবিলম্বে নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্তের আওতায় আনা জরুরি। অন্যথায় এই অভিযোগগুলো শুধু স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নয়, বরং পুরো রাষ্ট্রের সেবামূলক ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থাকে স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।