২২ কোটির বিনিময়ে ডিসি পদ,প্রশাসনের অন্দরমহলে টাকার রাজনীতি

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক :: দেশের প্রশাসন এখন যেন এক ভয়াবহ মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে—যেখানে নীতির জায়গা দখল করছে টাকার জোর, আর মেধা ও যোগ্যতার জায়গা দখল করছে তদবির ও চুক্তির রাজনীতি। চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক (ডিসি) নিয়োগকে ঘিরে ২২ কোটি টাকার লেনদেনের অভিযোগ সেই দুর্নীতির গভীরতম চিত্র উন্মোচন করেছে। আরও বিস্ময়ের বিষয় হলো এই ঘটনার জের ধরেই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. মোখলেস উর রহমানকে পদচ্যুত হতে হয়েছে।

*চট্টগ্রামের ডিসি নিয়োগ প্রশাসনিক পদ না, এখন বাণিজ্যের আসর*

চট্টগ্রাম দেশের বাণিজ্যিক রাজধানী ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জেলা। সেখানে জেলা প্রশাসকের পদ মানে শুধু প্রশাসনিক ক্ষমতা নয়; অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও রাজনৈতিক প্রভাবের কেন্দ্রবিন্দু। এমন একটি পদ যদি কোটি টাকার দরদামে বিক্রি হয়, তবে সেটি কেবল দুর্নীতি নয় রাষ্ট্রযন্ত্রের আত্মহত্যার সমান।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, নওগাঁর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আউয়ালকে চট্টগ্রামের ডিসি পদে বসানোর নেপথ্যে ছিল ২২ কোটি টাকার অঘোষিত “চুক্তি”। এর মধ্যে নগদ ৬ কোটি টাকাই আগাম পরিশোধ করা হয়েছে বলে অভিযোগ। ভয়ঙ্কর তথ্য হলো—এই নিয়োগে তদবির করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টা আসিফ নজরুল। অভিযোগ অনুসারে, আগাম টাকার মধ্যে ৪ কোটি পেয়েছেন তিনি নিজে, আর ২ কোটি গিয়েছে তৎকালীন জনপ্রশাসন সচিব মোখলেস উর রহমানের হাতে।

এ যেন রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামোকেই বাণিজ্যে রূপান্তরিত করা যেখানে ‘যোগ্যতা’ নয়, বরং দর কষাকষিই নির্ধারণ করছে কে হবে জেলা প্রশাসক, কে হবে সচিব, আর কে পাবে এনবিআরের চেয়ার।

*তদবির, প্রভাব ও সংঘাত, প্রশাসনের নতুন বাস্তবতা*

প্রশাসনের ভেতরের সূত্র বলছে, শুধু আসিফ নজরুলই নন আরও কয়েকজন উপদেষ্টার নিজস্ব “প্রার্থী” ছিল চট্টগ্রামের ডিসি পদে। আসিফ মাহমুদ ও তালাত মাহমুদ তাঁদের তদবির সত্ত্বেও পিছিয়ে পড়েন। ফলাফল অভ্যন্তরীণ সংঘাত, নালিশ, আর শেষ পর্যন্ত এক সচিবের পদচ্যুতি।

এখানে প্রশ্ন উঠছে—একজন উপদেষ্টা কীভাবে সরাসরি প্রশাসনিক নিয়োগে প্রভাব খাটাতে পারেন? উপদেষ্টা কার্যালয় কি এখন নিয়োগ বোর্ডের অংশ হয়ে গেছে? নাকি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এখন উপদেষ্টার কক্ষে টাকার অঙ্কে নির্ধারিত হয়?

*দুর্নীতির এই সংস্কৃতি রাষ্ট্রকে কোথায় নিয়ে যাবে*

জনপ্রশাসনের অভ্যন্তরে অনেকেই এই ঘটনাকে “নৈতিক দেউলিয়া” বলে আখ্যা দিচ্ছেন। তাঁদের মতে, পদ কেনাবেচার এই সংস্কৃতি যদি বন্ধ না হয়, তবে প্রশাসনের সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তারা একে একে হারিয়ে যাবেন। যিনি পদ পেতে কোটি টাকা ব্যয় করবেন, তিনি পরে সেই অর্থ ‘তুলে নেওয়ার’ পথ খুঁজবেনই। তখন প্রতিটি ফাইল, প্রতিটি প্রকল্প, প্রতিটি দরপত্রে ঢুকে পড়বে ঘুষের অঙ্ক।

দুর্নীতির এই জাল কেবল একজন কর্মকর্তার নয় এটি একটি পুরো ব্যবস্থার ব্যর্থতার চিত্র। প্রশাসনের ভেতর জন্ম নিচ্ছে এক নতুন শ্রেণি: “চুক্তিভিত্তিক আমলা” যাঁদের কাছে দেশ নয়, চুক্তিই বড়।

*সুশাসনের প্রতিশ্রুতি বনাম বাস্তবতা*

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দাবি করছে, তারা সুশাসন ও জবাবদিহিতার পথে হাঁটছে। কিন্তু চট্টগ্রামের এই নিয়োগ কেলেঙ্কারি সে দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। উপদেষ্টাদের হস্তক্ষেপ, টাকার লেনদেন, আর গোপন চুক্তির এই ধারাবাহিকতা দেখাচ্ছে স্বচ্ছতার অঙ্গীকার এখন কেবল মুখের বুলি।

*জনগণের প্রত্যাশা নিরপেক্ষ তদন্ত ও জবাবদিহিতা*

চট্টগ্রামের ডিসি নিয়োগ কেলেঙ্কারি কেবল একটি ব্যক্তির গল্প নয়; এটি একটি সিস্টেমের দুর্নীতিগ্রস্ত আত্মার প্রতিফলন। এখন প্রয়োজন সাহসী, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত।
যাঁরা টাকার বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় পদ বিক্রি করেছেন, তাঁদের পরিচয় বা প্রভাব যা-ই হোক—তাঁদের আইনের মুখোমুখি আনতেই হবে। অন্যথায় প্রশাসন থেকে সততার আলো নিভে যাবে, আর রাষ্ট্রে থেকে যাবে শুধু অন্ধকার আর অবিশ্বাস।