নিউজ ডেস্ক :: বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামো এক সময় ছিল সততা, মেধা ও দায়িত্ববোধের প্রতীক। সেই কাঠামোই আজ যেন ক্রমশ ভেঙে পড়ছে প্রভাব, চুক্তি ও দুর্নীতির কাছে। সাম্প্রতিক সময়ে সমাজকল্যাণ সচিব পদে ড. আবু ইউসুফের নিয়োগকে ঘিরে যে ৩৫ কোটি টাকার চুক্তির অভিযোগ উঠেছে, তা শুধু একটি নিয়োগ নয়—এটি গোটা প্রশাসনিক ব্যবস্থার নৈতিক সংকটের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছে।
প্রশাসনের ভেতরেই গুঞ্জন, এই পদায়নের পেছনে কাজ করেছে এক সুবিন্যস্ত অর্থনৈতিক লেনদেন। অভিযোগ অনুযায়ী, ৩৫ কোটি টাকার বিনিময়ে সচিব পদটি নিশ্চিত করা হয় এবং এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল কারিগর ছিলেন সচিবের শ্যালক মোহাম্মদ হোসেন আলী। তাঁর নির্দেশনা ও তদবিরেই এই চুক্তির বাস্তবায়ন সম্পন্ন হয় বলে জানা গেছে।
হোসেন আলীর প্রভাব এখন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের প্রতিটি দপ্তরে স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। কর্মকর্তারা মুখ খুলতে সাহস পান না, ফাইল ওঠানামা হয় তাঁর অনুমোদনে, এবং সচিবের নাম ব্যবহার করে তিনি যেন এক অঘোষিত ‘অধিপতি’তে পরিণত হয়েছেন। নিজেই তিনি বলেছেন, “সচিব সকাল-বিকেলে ফোন দিয়ে খোঁজখবর নেন।” এই মন্তব্যটি যেন প্রমাণ করে, প্রশাসনিক দায়িত্ব এখন ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার বলয়ে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে।
আরও উদ্বেগজনক তথ্য হলো, সারা দেশে ৪৬০ টি প্রতিবন্ধী স্কুল স্বীকৃতি অনুমোদনে থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকার লেনদেন ভাগাভাগির অংশ হিসেবে চুড়ান্ত হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। যে মন্ত্রণালয় সমাজের প্রান্তিক ও অসহায় জনগোষ্ঠীর সেবায় নিবেদিত থাকার কথা, সেখানেই যদি দুর্নীতির এমন ছায়া নেমে আসে, তবে সেটি কেবল অর্থনৈতিক অপরাধ নয় এটি নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রকাশ।
প্রশাসনের ভেতরের অনেক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সচিব পদায়নের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে আর্থিক লেনদেনই মুখ্য হয়ে উঠেছে। এই সংস্কৃতি কেবল প্রশাসনকেই কলুষিত করছে না, বরং মেধাবী ও সৎ কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে দিচ্ছে।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এমন একটি সংস্থা, যা প্রতিবন্ধী, বয়স্ক, বিধবা, অনাথ ও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জন্য রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালন করে। সেখানে যদি নেতৃত্ব দুর্নীতি, চুক্তি ও আত্মীয়প্রীতির জালে বন্দি হয়ে পড়ে, তাহলে তা শুধু মন্ত্রণালয়ের অকার্যকারিতা নয় এটি সমাজের ন্যায়ের ধারণাকেই ধ্বংস করে দেয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ঘটনাটি বিচ্ছিন্ন নয়; বরং রাষ্ট্রযন্ত্রে “চুক্তিভিত্তিক পদায়ন” এখন এক প্রাতিষ্ঠানিক রোগে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক ছায়া, প্রশাসনিক যোগসাজশ, এবং আর্থিক স্বার্থ—সব মিলিয়ে একটি অদৃশ্য জাল তৈরি হয়েছে, যার ভেতরে আটকা পড়ে যাচ্ছে রাষ্ট্রের সততা।
আজ সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অবস্থা সেই গভীর সংকটের প্রতীক, যেখানে ক্ষমতা মানে সেবা নয়, সুযোগ; আর পদায়ন মানে দায়িত্ব নয়, লেনদেন।
এই প্রক্রিয়া যতদিন চলবে, ততদিন জনগণের আস্থা যেমন ক্ষয়ে যাবে, তেমনি রাষ্ট্রের নৈতিক ভিত্তিও ধসে পড়বে নিঃশব্দে, কিন্তু ভয়াবহভাবে।