নিউজ ডেস্ক :: বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) মাঠপর্যায়ের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কেন্দ্রীয় শক্তি। কিন্তু প্রতিষ্ঠানের এই গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোর ভেতরেই মাঝে মাঝে দেখা দেয় অনিয়ম, প্রভাব ও সুশাসনের সংকট। টুঙ্গীপাড়া উপজেলা প্রকৌশলী আনিছুর রহমানকে ঘিরে সাম্প্রতিক বদলি-বিতর্ক ঠিক সেই সংকটেরই তীব্র প্রতিফলন যেখানে উঠে এসেছে বদলি আদেশ বাতিলের পেছনে ৫০ লাখ টাকার কথিত লেনদেনের অভিযোগ।
তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন প্রথমে আনিছুর রহমানকে মেহেরপুরে বদলি করেন। পরে সংশোধিত আদেশে তাকে মাদারীপুর সদরে পোস্টিং দেওয়া হয়। সাধারণ নিয়মে বদলির আদেশ জারি হলে কর্মকর্তাকে নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ থাকে। কিন্তু এই ক্ষেত্রে পরিস্থিতি ভিন্ন পথে মোড় নেয়। নতুন প্রধান প্রকৌশলী জাভেদ করিম দায়িত্ব নেওয়ার পর বদলির আদেশটি হঠাৎ বাতিল হয়—যা প্রশাসনিক মহলে বিস্ময় তৈরি করে।
স্থানীয় ও অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর দাবি, এই বদলি প্রত্যাহারের পেছনে আর্থিক লেনদেনের চাপ ও প্রভাব ছিল, এবং প্রক্রিয়াটি এগোতে নাকি ৫০ লাখ টাকার সমঝোতা একটি ভূমিকা রেখেছে। যদিও এলজিইডি বা সরকারি কোনো পক্ষ আনুষ্ঠানিকভাবে এ অভিযোগ স্বীকার করেনি, তবুও বদলি—সংশোধন—বাতিল—দীর্ঘ বহাল থাকা—এই পুরো ধারাবাহিকতা স্বাভাবিক প্রশাসনিক আচরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় বলে সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে।
টুঙ্গীপাড়ায় দীর্ঘ সময় দায়িত্ব পালনের সুযোগে প্রকৌশলী আনিছুর রহমান নাকি স্থানীয় কিছু ঠিকাদারি গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা গড়ে তুলেছেন—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিন থেকেই আলোচনায় রয়েছে। অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে—অপদস্থ ঠিকাদারদের বিল উত্তোলনে সহায়তা, সরোজমিন যাচাই ছাড়াই বিল নিষ্পত্তি এবং পলাতক ঠিকাদারদের কাজে সুযোগ করে দেওয়া। এসব অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও বারবার একই ধারার অভিযোগ ওঠা এলজিইডির মাঠপর্যায়ের তদারকির ওপর বড় প্রশ্ন তৈরি করছে।
স্থানীয়দের আরেকটি মন্তব্য হলো—বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আনিছুর রহমান প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠতা ব্যবহার করে প্রকল্প, বরাদ্দ এবং ঠিকাদারি কাজে সুবিধা পেয়েছেন। নতুন প্রশাসনিক ব্যবস্থাতেও তিনি নাকি স্থানীয় উন্নয়ন কাজে প্রভাব বজায় রাখার চেষ্টা করছেন—এমন কথাও বিভিন্ন মহলে ঘুরে বেড়াচ্ছে, যদিও এর কোনো প্রমাণ আনুষ্ঠানিকভাবে পাওয়া যায়নি।
টুঙ্গীপাড়া উপজেলা প্রকৌশলীকে ঘিরে এই বদলি-বিতর্ক শুধু একজন কর্মকর্তার বিতর্ক নয়; এটি এলজিইডির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা, বদলি নীতি, স্বচ্ছতা, পর্যবেক্ষণ এবং জবাবদিহিতার গভীর সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে। বিশেষ করে বদলি-বাতিলের ঘটনাগুলো রাজনৈতিক প্রভাব, ব্যক্তিগত স্বার্থ ও অদৃশ্য চক্রের উপস্থিতিকে আরও স্পষ্ট করে।
এলজিইডির মতো জনস্বার্থ-নির্ভর প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের বিতর্ক শুধু প্রকল্প নয়—সমগ্র উন্নয়ন ব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট করে। তাই পুরো ঘটনার স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি, যাতে প্রতিষ্ঠানটির বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা পায় এবং মাঠপর্যায়ের সুশাসন নিশ্চিত হয়।