দিনপত্র ডেস্ক :: বাংলাদেশের সঙ্গে চলমান ঋণ কর্মসূচির পরবর্তী কিস্তি ছাড় স্থগিত করেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল। সংস্থাটি জানিয়েছে, রাজস্ব, ব্যাংকিং ও আর্থিক খাতে নির্ধারিত সংস্কার বাস্তবায়নে ব্যর্থ হওয়ায় জুন মাসের মধ্যে কিস্তি ছাড় দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। বরং অতিরিক্ত শর্ত যুক্ত করে নতুন ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
ওয়াশিংটন ডিসিতে অনুষ্ঠিত বিশ্বব্যাংক–আইএমএফ বসন্তকালীন বৈঠকে অংশ নেওয়া বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের সদস্যরা জানিয়েছেন, ৫.৫ বিলিয়ন ডলারের কর্মসূচির আওতায় জুনে ১.৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার যে আশা ছিল, তা এখন অনিশ্চিত। এমনকি বর্তমান কর্মসূচি বহাল থাকলেও পরবর্তী অর্থ ছাড় সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পিছিয়ে যেতে পারে।
আইএমএফের অভিযোগ অনুযায়ী, চুক্তির শর্ত হিসেবে থাকা গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার—রাজস্বখাত পুনর্গঠন, ব্যাংকিংখাত শক্তিশালী করা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিতে ভর্তুকি কমানো এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার চালু—কোনোটিই কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে নতুন করে পরিস্থিতি মূল্যায়ন (রিভিউ) না করে তারা অর্থ ছাড় দিতে রাজি নয়।
এদিকে, সম্প্রতি পাস হওয়া ব্যাংক রেগুলেশন আইনে বিতর্কিত ১৮ক ধারা যুক্ত করে সমস্যাগ্রস্ত ব্যাংকের পুরনো মালিকদের ফেরার সুযোগ দেওয়ায় উদ্বেগ জানিয়েছে সংস্থাটি। পাশাপাশি আমানতকারীদের ক্ষতিপূরণে সরাসরি বাজেটের অর্থ ব্যবহারের পরিকল্পনারও সমালোচনা করা হয়েছে। আইএমএফের মতে, এ ধরনের ক্ষতিপূরণ ডিপোজিট ইন্স্যুরেন্স স্কিম বা বিকল্প ব্যবস্থার মাধ্যমে হওয়া উচিত।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চাপ তৈরি করছে। বিশেষ করে ইরান–ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। এ অবস্থায় বাংলাদেশ আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকসহ উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থায়নের চেষ্টা করছে। তবে আইএমএফের কঠোর অবস্থানের কারণে তুলনামূলক সহজ শর্তে ঋণের জন্য বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনাও জোরদার করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ২০২৩ সালে শেখ হাসিনা সরকারের সময় বাংলাদেশ আইএমএফের সঙ্গে ৪.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণচুক্তি করে, যা পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় বাড়িয়ে ৫.৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা হয়। এর মধ্যে ৩.৬৪ বিলিয়ন ডলার ইতোমধ্যে ছাড় হয়েছে এবং বাকি ১.৮৬ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার কথা রয়েছে, যার মেয়াদ আগামী জানুয়ারিতে শেষ হবে।
আইএমএফের এশিয়া ও প্যাসিফিক বিভাগের পরিচালক কৃষ্ণ শ্রীনিবাসন জানিয়েছেন, বর্তমান সরকারের শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান বড় ধরনের সংস্কার বাস্তবায়নের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। তিনি বিশেষভাবে কর-জিডিপি অনুপাত বাড়িয়ে রাজস্ব আহরণ জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
অর্থনীতিবিদদের মতে, কাগজে-কলমে কিছু উদ্যোগ নেওয়া হলেও বাস্তবে কাঙ্ক্ষিত সংস্কার হয়নি। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, কম রাজস্ব আহরণ এবং বাজারভিত্তিক বিনিময় হার কার্যকর না হওয়াই আইএমএফের অসন্তোষের প্রধান কারণ।
সব মিলিয়ে পরিস্থিতি স্পষ্ট—দ্রুত ও কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন করতে না পারলে শুধু বর্তমান ঋণ কর্মসূচিই নয়, ভবিষ্যতের আন্তর্জাতিক অর্থায়নও আরও কঠোর শর্তের মুখে পড়তে পারে।