প্রতিবন্ধী স্কুল স্বীকৃতি ,এমপিওভুক্তিতে দুর্নীতির ছায়া,কাগুজে প্রতিষ্ঠানে ঘুষ বাণিজ্যের নতুন অধ্যায়

লেখক: নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ৫ মাস আগে

নিউজ ডেস্ক :: প্রতিবন্ধী শিশুদের শিক্ষার অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। কিন্তু বাস্তব চিত্র বলছে, এই মানবিক ক্ষেত্রটিও আজ জড়িয়ে পড়েছে ঘুষ, দুর্নীতি আর রাজনৈতিক প্রভাবের জালে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সর্বশেষ উদ্যোগে যখন সারাদেশে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়গুলোকে এমপিওভুক্ত করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, তখনই উঠছে ভয়াবহ অনিয়ম ও অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ।

মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, সারাদেশ থেকে প্রায় ১৭ হাজার প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় এমপিওভুক্তির জন্য আবেদন জমা দেয়। পরে সচিবালয়ের নির্দেশে এসব প্রতিষ্ঠানের ওপর এক বিস্তৃত সার্ভে পরিচালিত হয়। সেই সার্ভে রিপোর্টে উঠে আসে চমকে দেওয়ার মতো তথ্য— অনেক বিদ্যালয় বাস্তবে না থেকেও শিক্ষার্থী সংখ্যা দেখিয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে আবেদন করেছে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, একটি প্রকৃত স্কুলের শিক্ষার্থীদের ভাগ করে একাধিক নতুন “কাগুজে স্কুলে” দেখানো হয়েছে।

*পুরনো ৪৬০ স্কুলে নতুন ঘুষের ফাঁদ*

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ৪৬০টি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় যাচাই-বাছাই করা হয়েছিল স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্দেশ্যে। অভিযোগ রয়েছে, এই যাচাই প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার করেছিলেন দলীয় এমপি, নেতা ও তাদের ব্যক্তিগত সহকারীরা (পিএ/এপিএস)। বহু ক্ষেত্রে স্কুল প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষক নিয়োগে টাকার বিনিময়ে নাম যুক্ত করা হয়েছিল।

বর্তমান সরকারের আমলে আবারও এই ৪৬০টি স্কুলের নাম আলোচনায় এসেছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্র জানায়, এবার ঐসব বিদ্যালয়কে স্বীকৃতি দেওয়ার নামে শুরু হয়েছে নতুন বাণিজ্য। শিক্ষক পদে প্রতি জনের জন্য দুই লাখ, কর্মচারী পদে এক লাখ টাকা ঘুষ দাবি করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে সমাজ কল্যান সচিব ও উপদেষ্টা যৌথ ভাবে ঘুষের অর্থ নিবেন ।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্য হলো, এই ৪৬০ বিদ্যালয়ের মধ্যে মাত্র ৫০টি স্কুল বাস্তবে চালু আছে, বাকি ৪০১টি কেবল কাগজে-কলমে টিকে আছে। অর্থাৎ, এসব তথাকথিত বিদ্যালয় স্বীকৃতি পেলে শুরু হবে বিশাল নিয়োগ বানিজ্য— যেখানে একেকটি শিক্ষক পদ বিক্রি হতে পারে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষের বিনিময়ে।

*মানবিক শিক্ষাকে ব্যবসায় রূপান্তর*

প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য শিক্ষা শুধু সামাজিক দায়িত্ব নয়, এটি সংবিধান ও আন্তর্জাতিক চুক্তি অনুযায়ী রাষ্ট্রের বাধ্যবাধকতা। অথচ বাস্তবে এই শিক্ষা ব্যবস্থাই এখন পরিণত হয়েছে ব্যবসায়িক ঘুষবাণিজ্যের নতুন প্ল্যাটফর্মে।

একজন সমাজবিজ্ঞানী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“প্রতিবন্ধী শিক্ষা খাতে দুর্নীতি মানে শুধু টাকার অপচয় নয়, এটি হাজারো শিশুর ভবিষ্যৎ কেড়ে নেওয়া। এরা সমাজে একীভূত হওয়ার সুযোগ হারাচ্ছে।”

*অভিযোগ নীরব প্রশাসনের প্রতি*

এই অভিযোগগুলো নিয়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি। তবে অভ্যন্তরীণ সূত্রে জানা যায়, পুরো প্রক্রিয়াটি এখন “নীতিগত অনুমোদন” পর্যায়ে রয়েছে, এবং রাজনৈতিক প্রভাবশালী মহলের চাপে সিদ্ধান্ত দ্রুত চূড়ান্ত করার চেষ্টা চলছে।

দেশে প্রতিবন্ধী শিশুদের সংখ্যা সরকারি হিসেবে প্রায় ১৫ লাখ, যাদের বড় অংশ বিদ্যালয়ে যেতে পারে না। অথচ যেসব স্কুল তাদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কথা, তার অনেকগুলোই কেবল “নথির ভেতর” আছে। প্রশ্ন উঠছে— রাষ্ট্রের এই অক্ষমতা কি কেবল প্রশাসনিক ব্যর্থতা, নাকি এটি এক সংগঠিত দুর্নীতির চক্রের সফল ব্যবসা?

মানবিকতার জায়গা থেকে এখন সবচেয়ে জরুরি—
স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহি এবং প্রকৃত প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়গুলোকে ন্যায্য স্বীকৃতি।
অন্যথায়, “প্রতিবন্ধী শিক্ষা” কেবল ঘুষের আরেক নাম হয়ে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হবে।