নিজস্ব প্রতিবেদক
গ্রামীণ ব্যাংকের কার্যক্রম ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে ২০১১ সালে গঠিত এক সরকারি তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে একাধিক গুরুতর অনিয়ম ও আইনি লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছিল। ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ ২০১১ সালের ১০ জানুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই কমিটি গঠন করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক এ. কে. মোনাওয়ার উদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের কমিটি একই বছরের ২৫ এপ্রিল সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, গ্রামীণ ব্যাংক–এর আওতায় আইন বহির্ভূতভাবে একাধিক সহযোগী প্রতিষ্ঠান গঠন এবং সেগুলোতে ব্যাংকের তহবিল স্থানান্তরের ঘটনা ঘটেছে। কমিটির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ব্যাংকের সরাসরি মালিকানাগত সম্পর্ক না থাকায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
ক্ষমতার সীমা অতিক্রমের অভিযোগ
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, গ্রামীণ ব্যাংক অধ্যাদেশ ১৯৮৩–এর সীমার বাইরে গিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গঠন ও পরিচালনা করা হয়েছে। ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও কর্মকর্তাদের কেউ কেউ এসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান বা পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা আইনগতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ বলে কমিটি মন্তব্য করে। পাশাপাশি, সরকারি কর্মচারী হিসেবে দায়িত্বে থাকা অবস্থায় কিছু কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের গ্যারান্টর হয়েছেন বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়।
তহবিল স্থানান্তর ও আর্থিক অনিয়ম
তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, দাতা সংস্থার দেওয়া প্রায় ৯৩ কোটি টাকা যথাযথ অনুমতি ছাড়া ‘গ্রামীণ ফান্ড’ ও ‘গ্রামীণ কল্যাণ’-এ স্থানান্তর করা হয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে ঋণ মওকুফের সিদ্ধান্ত নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। কমিটির ভাষ্য অনুযায়ী, নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ঋণ ও সুদ মওকুফ এবং টেন্ডার প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে সেবা গ্রহণকে স্বার্থের সংঘাত হিসেবে দেখা হয়েছে।
এছাড়া ‘গ্রামীণ কল্যাণ’-এ অর্থ স্থানান্তরের পেছনে কর–সংক্রান্ত সুবিধা নেওয়ার উদ্দেশ্য ছিল কিনা, সে বিষয়েও তদন্তে প্রশ্ন তোলা হয়।
প্রশাসনিক ও নীতিগত লঙ্ঘনের অভিযোগ
প্রতিবেদনে বলা হয়, ব্যাংকের নিজস্ব ক্রয়নীতি উপেক্ষা করে কিছু প্রতিষ্ঠান থেকে সরাসরি পণ্য ও সেবা কেনা হয়েছে। ব্যবস্থাপনা পরিচালকের মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ার পর দায়িত্বে বহাল থাকা নিয়েও আপত্তি তোলা হয়। কমিটির পর্যবেক্ষণে আরও বলা হয়, নির্বাচিত নারী পরিচালকরা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় যথাযথ গুরুত্ব পেতেন না।
ব্যাংকের সম্পত্তি নামমাত্র ভাড়ায় একটি ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠানের কাছে বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত ছিল, যা ব্যাংকের আর্থিক স্বার্থের পরিপন্থী বলে উল্লেখ করা হয়।
মাঠ পর্যায়ে প্রভাব
তদন্ত প্রতিবেদনে ঋণ আদায়ে চাপ প্রয়োগ ও ঋণগ্রহীতাদের হয়রানির অভিযোগও উঠে আসে। কিছু ক্ষেত্রে সামাজিক ও মানবিক প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরে কমিটি। এছাড়া, ব্যাংকের নীতিমালা অনুযায়ী ভূমিহীন দরিদ্রদের ঋণ দেওয়ার কথা থাকলেও বিভিন্ন বড় প্রতিষ্ঠান ও ফাউন্ডেশনকে ঋণ প্রদানের অভিযোগও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস সে সময় গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে এবং অনেক অভিযোগই তিনি অস্বীকার করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে দেশে-বিদেশে ব্যাপক আলোচনা হয়। তবে ওই তদন্তের সুপারিশ বাস্তবায়ন ও পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে সরকারি পর্যায়ে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য সীমিত।