দিনপত্র ডেস্ক :: বর্তমান বিশ্ব এক অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হচ্ছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার ক্রমবর্ধমান সামরিক উত্তেজনা কেবল ঐ অঞ্চলের মানচিত্রকেই নয় বরং পুরো বিশ্বের অর্থনীতিকে এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরের প্রবেশদ্বার হরমুজ প্রণালি যা দিয়ে বিশ্বের এক চতুর্থাংশ জ্বালানি তেল পরিবাহিত হয় তা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হওয়ায় বিশ্ববাজারে তেলের দাম ও সরবরাহ নিয়ে চরম হাহাকার তৈরি হয়েছে। সমুদ্রপথে জ্বালানি আমদানির ঝুঁকি এবং জাহাজ ভাড়া ও বিমা খরচ যখন আকাশচুম্বী ঠিক তখনই বাংলাদেশের জন্য ত্রাণকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে জননেত্রী শেখ হাসিনার সরকার প্রধান থাকাকালীন গৃহীত ভারত বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ পাইপলাইন।
শেখ হাসিনার রাষ্ট্রপরিচালনার মূল দর্শন ছিল আগাম প্রস্তুতি ও জাতীয় স্বার্থের সর্বোচ্চ সুরক্ষা। ২০১৮ সালে যখন তিনি ভারতের নুমালিগড় রিফাইনারির সাথে ১৩০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই আন্তঃদেশীয় পাইপলাইন নির্মাণের সাহসী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তখন অনেকেই হয়তো এর সুদূরপ্রসারী তাৎপর্য অনুধাবন করতে পারেননি। কিন্তু আজকের এই বৈশ্বিক সংকটময় মুহূর্তে প্রমাণিত হয়েছে যে শেখ হাসিনার চিন্তা ছিল সময়ের চেয়েও অগ্রগামী। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর একচেটিয়া সমুদ্রপথের নির্ভরতা যে কোনো সময় ভূ রাজনৈতিক কারণে বিঘ্নিত হতে পারে। তাঁর সেই দূরদর্শী পরিকল্পনার বাস্তব সুফল আজ আমরা হাতেনাতে পাচ্ছি। দেশজুড়ে জ্বালানি তেলের মজুত স্বাভাবিক রাখতে এবং নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার যে জরুরি পদক্ষেপ নিয়েছে তার অংশ হিসেবে ভারতের আসামের নুমালিগড় রিফাইনারি থেকে ৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসা শুরু হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের বাণিজ্য ও অপারেশন বিভাগের মহাব্যবস্থাপক মুহাম্মদ মোরশেদ হোসাইন আজাদ নিশ্চিত করেছেন যে পাইপলাইনে পাম্পিং কার্যক্রম ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যেই এই ডিজেল দেশে পৌঁছাবে।
পরাশক্তিগুলোর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি ছিল শেখ হাসিনার নেতৃত্বের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। বর্তমানে ভারত বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতি ও ক্রমবর্ধমান শক্তির দেশ হওয়ার কারণে রাশিয়ার মতো পরাশক্তিগুলোসহ বিশ্ববাজারের প্রধান জ্বালানি সরবরাহকারী দেশগুলোর সাথে তাদের এক বিশেষ কৌশলগত ও বাণিজ্যিক সখ্যতা তৈরি হয়েছে। বড় অর্থনীতির প্রভাবে ভারত বিশ্ববাজার থেকে যেভাবে বিশেষ সুবিধায় ও সাশ্রয়ী মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করতে পারে শেখ হাসিনা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে সেই সফলতাকে বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তার সাথে যুক্ত করেছেন। তাঁর সরকার প্রধান থাকাকালীন করা সেই চুক্তির ফলেই আজ বৈশ্বিক অস্থিরতা সত্ত্বেও ভারতের বিশাল অর্থনৈতিক সক্ষমতার সুফল সরাসরি পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এটি কেবল একটি বাণিজ্যিক চুক্তি ছিল না বরং ভারতের বৈশ্বিক প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে দেশের মানুষের জন্য জ্বালানি ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার এক অনন্য মাস্টারস্ট্রোক।
ভারত বাংলাদেশের জনগণের জন্য এক পরীক্ষিত ও পরম বন্ধু। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে প্রতিটি জাতীয় সংকটে ভারত যেভাবে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে এই পাইপলাইন প্রকল্পটি তারই এক আধুনিক স্মারক। শেখ হাসিনার জাদুকরী নেতৃত্বে দুই দেশের সম্পর্ক যে উচ্চতায় পৌঁছেছিল তার সুফল আজ দেশবাসী ভোগ করছে। বর্তমান ভূ রাজনৈতিক সংকটে হরমুজ প্রণালি কেন্দ্রিক অস্থিরতা যখন আমদানিনির্ভর দেশগুলোকে বিপাকে ফেলেছে তখন শেখ হাসিনার করে যাওয়া এই অবকাঠামো ও চুক্তির মাধ্যমেই ভারত থেকে জরুরি জ্বালানি সহযোগিতা চেয়েছে তারেক রহমানের সরকার। এটি নিঃসঙ্কোচে প্রমাণ করে যে শেখ হাসিনার নেওয়া প্রতিটি সিদ্ধান্ত ছিল দলমতের ঊর্ধ্বে দেশের অর্থনীতির জন্য একটি শক্তিশালী নিরাপত্তা বলয়।
পরিবহন ঝুঁকি হ্রাস এবং প্রতি ব্যারেলে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ ডলার সাশ্রয় হওয়া বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর থেকে বিশাল এক চাপ কমিয়ে দিয়েছে। সমুদ্রপথে যুদ্ধাবস্থার কারণে যখন কার্গো জাহাজ আসা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ছে তখন ভূ গর্ভস্থ এই পাইপলাইনের মাধ্যমে ডিজেল আসা সম্পূর্ণ নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করছে। শেখ হাসিনার এই দূরদর্শিতা আজ কৃষকের সেচ পাম্প থেকে শুরু করে উত্তরাঞ্চলের ১৬টি জেলার কলকারখানার চাকা সচল রেখেছে যা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাকে করেছে অজেয়। পরিশেষে বলা যায় সঠিক সময়ে সঠিক কৌশল গ্রহণ করে ভারতের বিশাল অর্থনীতির প্রভাব ও বন্ধুত্বের সুফল কীভাবে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হয় শেখ হাসিনা তাঁর রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা দিয়ে তা বিশ্বকে দেখিয়ে দিয়েছেন। তাঁর এই অনন্য কর্মপরিকল্পনাই আজ বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এক অভেদ্য সুরক্ষা কবচ হিসেবে কাজ করছে।